শারদুল সজলের সাতটি কবিতা

চুমুফুলের সুবাস ❑

এই মনখারাপের দিনে তোমাকে কী আমি একটিও চুমু দেবো না? বৃষ্টি শেষ হয়েছে কখন! উঠোনের বাঁ-পাশ থেকে লেবুফুলের গন্ধ হামলে পড়ছে জানালায় বাতিটা নিভে যায়! যায় বুঝি—মুখটা আড়াল ক'রো না এই মন খারাপের দিনে তোমাকে কি আমি একটুও চুমু দেবো না? ২. যে যাই বলুক তুমি যদি ফিরে না আসো তবে বাজেয়াপ্ত হবে এই শহরের সকল সঙ্গম! নারী-পুরুষের দরোজায় প্রকাশ্যে তালা ঝুলিয়ে তরল জোছনায় ছড়িয়ে দেবো নিদ্রাহীন সংশয়ের দিন যে যাই বলুক, যতই ভাঙুক এই বৃষ্টিচি‎হ্ন রাতে তুমি ফিরে না এলে বাজেয়াপ্ত হবে এই শহরের সকল সঙ্গম!  

চুম্বক আবিষ্কারের ইতিহাস ❑

চুমুর দৈর্ঘ্য মেপে উড়ে যায় বালকবয়স। আলবিরুনীর গণিতসূত্রে নেচে ওঠে জাফরানি আনারস তোমার বুক ম্যাগনেশিয়া অঞ্চল আমাকে টেনে টেনে উত্তাপ ছড়াচ্ছে কিভাবে ভুলে যাব চুম্বক আবিষ্কারের ইতিহাস? নবম শ্রেণিতে প্রথম চুমুর বিনিময়ে চুম্বকের আবিষ্কার সবল স্বাস্থ্যের শহরে দেড়শ ডিগ্রি তাপের ধারাপাত ঠোঁটের ডগায় রেখে বৃত্তের মডেল দেখালে তোমার শরীরে এঁকে তারপর বুঝালে চুম্বকশক্তি চুমুর তরলে কতটা জ্বলে জ্বলতে জ্বলতে কত ডিগ্রি অ্যাঙ্গেলে টানে ও মহল্লার বড়দি—পিথাগোরাসের উপপাদ্য বুঝতে গিয়ে তোমার কাছেই প্রথম শিখলাম—বৃত্ত থেকে বিন্দু বড় সেদিন যদি স্বীকার করতাম, তবে কি জোছনার ভেতর গলে পড়ত আস্ত ডালিমের নেশা?  

আয়ুর চিনিদানা ❑

একটি আনন্দিত মুখের ছবি তুলতে হাসি জমাচ্ছি রিভোটিল রাত! চোখ ফসকে উড়ে যায় ঘুমের নগর চশমার বাঁকা লেন্সে সমুদ্রের অনুবাদ দেখতে এসে টিকটিকির লেজের শৈশবে গলে পড়ে সুদর্শন গন্ধ! লাফায় দৌড়ায় জমা থাকে না তৃতীয় উদয়ের শেষ রেণু শীতের-খাবার মজুদে পিপীলিকাগুলো গর্তের ভেতর হলেন্ডিয়ার মৃদু ঠোঁটে আমাকে টানে তুলে খায় পিপাসিত আয়ুর চিনিদানা তারপরও! হেঁসেলের বৃষ্টি খুঁড়ে একটু একটু গোছাতে থাকি তারাভর্তি ঘাসের অক্ষর আয়না ভেঙে যে মুখ আজও অচেনা!  

রহস্যের স্কুল ❑

শূন্যআরশির জলপুকুরে নিশিপুরের জহিরুল আজ দু’দিন—ঘুমহীন রাতদিন ছড়াচ্ছে জগৎ তফাতের গতিরেখা! পাটিগণিত বীজগণিত খুব ভালো বুঝত সে—এমনটি নয় তবুও যেন কিভাবে যোগ বিয়োগের সরল সমীকরণে এই পৃথিবী সমান ০ করেছে মানুষকে ১ বাকি সব ২ করে এক যোগ ‘এক’ ২ দিয়ে ভাগ করে— শূন্য—‘এক’ এঁকে পৃথিবীর মান আসে                         শূন্য আর একযোগে মানুষ বাঁচে                         শূন্য আর একগুণে মানুষ নাচে! দূরে কিংবা কাছে মানুষের দীর্ঘ ছায়ায় নেমে আসে পাপ! শূন্যতার শূন্য রহস্যে জীবনের সাথে মিশে যায় লোভ! মানুষকে তখন মননদহনে ধুতে হয় পৃথিবীর ঘাম ও                                      কৃষ্ণচূড়া আগুন শূন্যজোড়ের সকল ভাগ ২-এর নিটোল রহস্যে পৃথিবীজুড়ে সাজায় সংসার মায়াপুরের চিকন রাস্তার ভাঁজ খুলে পোষা-কবুতর যেদিন উড়াল অন্ধকার বুঝে যায় সেদিন যে-কেউ হয়ে যায় নিশিপুরের জহিরুল অঘুম আনন্দ কিংবা আকাশ!  

ভবিষ্যৎ ❑

পৃথিবীর সবকিছু সবকিছু ছাড়া বেঁচে উঠবে পড়ে থাকবে প্রয়োজনীয় সঙ্গম সৌরনিদ্রার নৈশঘড়িতে পৃথিবীর গোলার্ধ ছিঁড়ে ভেঙে পড়বে বসন্তের বিউগল ওষুধি-স্তনের মরুভূমিতে সকল সঙ্গম ব্যর্থ হয়ে হাহাকার ছড়াবে নকশিকাঁথার মিহি সেলাই সেদিন গুরুত্ব থাকবে না মাতৃত্বের পিতৃত্বের! একখণ্ড মাংসময় খাঁচার স্কেচে রমণী পুরুষ এলিয়েন সঙ্গমের অপেক্ষা করবে যোনিগোলাপ শিশ্ন চুয়ে গলে পড়বে সময়িত লালা নারীর মধুকলসও জোছনা ছড়াবে না তৃষ্ণার সেদিন পুরুষ রাবারের কদবেলে স্ক্রু বসাবে; নারী রাবারের পিস্টনে স্ক্রু বসাবে সম্পর্ক নারী-পুরুষ কার দিকে যাবে, কার দিকে যাবে অপেক্ষার দীর্ঘ স্বরলিপি গিলে খাওয়া এক একটি প্রতীক্ষা! যেখানে উত্তরাধিকারের পরম্পরা দীপ জ্বেলে আছে বছরের পর বছর  উদ্ভিদের শিকড়মূলে পুষ্পিত অবিনশ্বর ইচ্ছে করলেই ভাঙা যায় না বৈচিত্র্যের টুর্নামেন্ট! কালের অজগর উঠে গেছে প্রজন্মের স্বভাবে ডোরাকাটা মাংসপোশাকে প্রতিদিন হয়ে ওঠছে ব্যাঙ সাপ কিংবা খরগোশ এভাবে বেঁচে থাকা— এভাবে সময় ভেঙে সময়ের ঊর্ধ্বে ওঠা!  

হাড়ের মিউজিয়াম ❑

ক্যাসেটের ফিতের মতো পড়ে আছে জীবন যৌবন ও সবিনয়ের দুটি চোখ—প্রার্থনা ভেঙে কালের অজগর উঠে গেছে শপিংমলে—ডোরাকাটা মাংসপোশাকে প্রাত্যহিক মাছি ওড়ে পৃথিবীজুড়ে পাঁচপঞ্চাশ টাকার নোটে ভাগাভাগি মেয়েটি অন্ধকার অক্ষরে রক্তচালিত ইঞ্জিনের তুফানে নাচে ভালোবেসে যে হরিণী হারিয়ে গেছে অরণ্যের অধীনে তার পায়ের ছাপ ধরে এক মৃত বাঘিনীর শাবক বেঁচে আছে মাংসের ভেজা গন্ধ শুঁকে ১৪. জানি—থুথু খেয়ে জলের তৃষ্ণা মেটে না। তবে কারও কারও মেটে কেউ কেউ বেঁচে ওঠে দিব্যি সতেজে, দিকচক্রচক্রান্তে দাবি করে পুরো পৃথিবী। জানি—জীবনের অপচয় থাকে, থাকে বীর্য ও বিশ্বাসের অপচয় ক্লেদ, আক্ষেপ, কারফিউ চারদিকে— মানুষ সমুদ্রের মাঝিকে ডেকে তোলে মানুষশিকারে ভাসে কলম্বাসের খুনতরী!  

বোকা মায়ের গল্প ❑

চাঁদের বারান্দায় এ কা’র লাশ? কা’র বিরহে ভেসে গেছে গোলাপ-গন্ধের ইতিহাস! আলফা সেনচুরির নিকটবর্তী হয়ে কষ্টগুলো আমাদের ঘরে বড় হয়েছে, মাও আহ্লাদি ওগুলোর যত্ন করে করে রোঁয়া চৌকাঠে                                            একের পর এক                                                      সাজিয়ে রেখেছে আর বাবা নিরুদ্দেশ ভোরের বাজার থেকে প্রতিদিন ব্যাগভর্তি অন্ধকার কিনে বাড়ি ফিরতেন মা যতই এক টুকরো হাসি রান্না করতে চাইতেন দুঃখগুলো ততই আমাদের হাঁড়িতে নেচে উঠত মা আড়ালে তা লোকমা ভরে গিলে খেয়ে আমাদের প্লে­টে দানা দানা শাদা আনন্দ ঢেলে দিতেন
শারদুল সজল

শারদুল সজল

জন্ম ৭ জুন ১৯৮৪, বাসাইল, টাংগাইল। শিক্ষা : মাস্টার্স। পেশা : শিক্ষকতা।...বিস্তারিত