গার্সিয়া মার্কেসের সন্ধানে কলম্বিয়া 

১ম পর্বের লিংক


সান্তা মার্তা

সান্তা মার্তা মাত্র চল্লিশ মিনিটের পথ। অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটগুলো যত অল্প সময়েরই হোক না কেন, অন্তুত পানি ও হাল্কা কিছু খেতে দেবেই। কিন্তু আমেরিকার অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটগুলোতে, নিউইয়র্ক থেকে শিকাগো, তারপরে শিকাগো থেকে সান দিয়েগো দুটি ভিন্ন ফ্লাইটে একেকটায় তিন-চার ঘন্টার পথ সত্ত্বেও খাবার পরিবেশন তো দূরের কথা, পানিটাও কিনে খেতে হবে—এমনই বেনিয়ার জাত এই মার্কিন মালিকগুলো। এর আগেও এবং পরেরও আমি দেখেছি, লাতিন আমেরিকান অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটগুলো ওদের মতো এতটা কৃপণ নয়।

চল্লিশ মিনিটের পথ এক রকম উঠতে না উঠতেই পৌঁছে গিয়েছি আরেক বিমানবন্দরে। এরোড্রাম থেকে বেরুতে খুব বেশি সময় লাগে নি আমাদের, যেহেতু প্লেনের পেটের ভেতরে আমাদের কোনো লাগেজ ছিল না, যা ছিল, তা ওই ক্যারিঅন, মানে হাতবাহী ব্যাগ। সুতরাং বিমানের দরজা খোলার অল্প সময়ের মধ্যে ইমিগ্রেশন পার হয়ে আমরা বাইরে এসে দাঁড়িয়েছি। বাইরে তখন সন্ধ্যা। এর পরের গন্তব্য আরাকাতাকা, মার্কেসের সেই জন্মের গ্রাম। কিন্তু কিভাবে যাব? এবার বাকিটুকু যেতে হবে সড়কপথে। আমার ও তাপসের কোনো ধারণা নেই বাকি পথে যাওয়ার ব্যাপারে। কিন্তু আনিস থাকলে যে-কোনো দুর্গম ও অচেনা জায়গাতেও পথ তৈরি হয়ে যায়। ওর কাছে নিশ্চয়ই জিপিএস আছে। জিপিএস মানে আরাকাতাকার বাসিন্দা সেনঞর রাফায়েল। আনিস ওনার সাথে অবিরাম যোগাযোগ রক্ষা করে চলছে, অতএব, আমাদের চিন্তা করার, মানে দুশ্চিন্তা করার কোনোই কারণ নেই। সম্ভবত রাফায়েলই ফোনে আনিসকে পরামর্শ দিয়েছে একটি ট্যাক্সি ভাড়া করে বাকি পথটুকু পৌঁছার। সান্তা মার্তা এয়ারপোর্টের সামনেই অনেক ট্যাক্সি দাঁড়ানো, ওদেরই একটির চালকের সঙ্গে আনিস কথা বলে ঠিক করে ফেলেছে। এবার যেন মাকোন্দো যাওয়ার দুর্গম পথের শুরু আমাদের। আমরা তিনজনই বসেছি গাড়ির পেছনের সিটে। আমার কাছে সবসময়ই আকাশপথে ভ্রমণের চেয়ে সড়কপথে গাড়িতে বা ট্রেনে ভ্রমণ সবচেয়ে বেশি আকর্ষণীয়। এই প্রথম মনে হলো অন্য কোনো দেশে নয়, যেন নিজের দেশেরই গ্রামের বাড়িতে যাওয়ার অভিজ্ঞতা হচ্ছে, অন্তত রাস্তাঘাটের অপ্রশস্ততা আর অনাগরিক উন্নয়নবিমুখ চেহারা দেখে এরকমই মনে হয়েছে আমার। আর যাওয়ার পথে গ্রাম ও কিছু দূর পরপর মরূদ্যানের মতো ছোট ছোট বাজারগুলো পেরুনোর সময় আমার বারবার শরীয়তপুরে গ্রামের বাড়িতে যাওয়ার অভিজ্ঞতা ও স্মৃতিই যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছিল। এত যে উন্নয়নবঞ্চিত এসব এলাকা, কিন্তু মানুষগুলোর মধ্যে এই রাতের বেলায়ও প্রাণচাঞ্চল্য যেন উপচে পড়ছে। আমার একবার ইচ্ছে হয়েছিল কোনো একটি বাজারের ভেতর দিয়ে যাওয়ার সময় একটুখানি দাঁড়িয়ে ওদেরকে দেখি, সিগারেট কিনবার ছলে একটু কথা বলার অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করি, কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছুতে দেরি হয়ে যাবে কিংবা গাড়ির ড্রাইভার তাতে সায় নাও দিতে পারে বলে সেই আশা আর পূরণ করা হয় নি।

বিখ্যাত সেই সিয়েনাগা, যা কলাচাষের জন্য বিখ্যাত, এবং মার্কেসের শতবর্ষের নিঃসঙ্গতার ভৌগোলিক পটভূমি হিসেবে কাজ করেছে। রাতের বেলা যখন এই কলার বিশাল বাগানের গা ঘেঁষে যাচ্ছিলাম তখন ভয় আর সেই কাল্পনিক কাহিনির উত্তেজনা আমার শরীরকে এক মিশ্র অনুভূতিতে ভরিয়ে দিয়েছিল। অন্ধকার যেন এই ভয়কে আরও গভীর করে তুলেছে। সম্মিলিত নক্ষত্রপুঞ্জের নিক্ষিপ্ত আবছা আলোয় চারিদিক গভীর ধূসর এক ধাবমান প্রতিমা ছড়িয়ে চলে যাচ্ছে দ্রুতগতিতে। অন্ধকারে অস্পষ্ট কলাগাছের সারিগুলোকেও ভীতিকর মনে হতে থাকে আমার। মনে হয় যেন কলাগাছের সারি নয়, ওগুলো যেন বঞ্চিত ও নিপীড়িত কলাচাষীদেরই চাপাতি যা যে-কোনো সময় আমাদের উপর এসে সদলবলে ঝাঁপিয়ে পড়বে। তাপস অনেকক্ষণ যাবৎ, একেবারে গাড়িতে ওঠার পর থেকেই একদম চুপচাপ বসে আছে। এর আগে সারাপথ জুড়ে ছিল তাপসের কথার ফোয়ারা। অস্বাভাবিক রকমের স্তব্ধতা তাপসকে নির্বাক করে রেখেছে অনেকক্ষণ ধরে। আনিস ও আমি এরকম পরিস্থিতির জন্য সবসময়ই মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকি। আমি তো বরং উত্তেজনাময় ও অভাবনীয় ঘটনাই বেশি উপভোগ করি। 

আরাকাতাকা 

সাপের মতো আঁকাবাকা আর অন্ধকারে ছাওয়া পথের শেষ হলো রাত সাড়ে দশটায়, যখন আমাদের স্বপ্নের গ্রাম আরাকাতাকায় পৌঁছলাম। এই সেই আরাকাতাকা! টেলিগ্রাফিস্ট-এর ছেলে গার্সিয়া মার্কেসের জন্মস্থান! বাংলাদেশের যে-কোনো মফস্বল শহরের চেয়েও সাধারণ একটি গ্রাম। মফস্বল বলার পরই গ্রাম বলাতে যে-কেউ ভাবতে পারেন আমি বুঝি স্ববিরোধিতা করছি। আসলে তা নয়। আমরা গ্রাম বলতে এখনও বুঝি টিনের ঘর মাটির ঘর, কদাচিত দুএকটি ইট দালানের ঘর, অনিয়মিত বিদ্যুত, খেতখামার। লাতিন আমেরিকার গ্রামগুলো ঠিক সেরকম নয়। মাটির ঘর নেই বললেই চলে। টিনের ঘরও বিরল। সবই ইটসিমেন্টে গড়া বাড়িঘর। এই আরাকাতাকায়ও তাই। হাটবাজারও আছে আমাদেরই মতো, কিন্তু তা নাগরিকতার স্পর্শ নিয়ে আমাদের চেয়ে খানিকটা ভিন্ন রূপে দাঁড়িয়ে আছে। লাতিন আমেরিকার অন্য যে-কোনো গ্রামের মতোই আছে শুঁড়িখানা, আছে ডিস্কোটেকও। আমাদের মানদণ্ডে এটি মফস্বলের কাছাকাছি হলেও লাতিন আমেরিকায় এটাই গ্রাম।

আরাকাতাকা রেলস্টেশন

মার্কেস বিখ্যাত হওয়ার আগে এটি আরও বেশি গ্রাম ছিল। বরং মার্কেসের খ্যাতির কারণে এর গ্রামীণ চরিত্রের উপর হঠাৎ করে শহুরে এক ধর্ষক যেন ঝাঁপিয়ে পড়েছে। ধীরে ধীরে এটি বারবনিতার মতো সাজগোজ শুরু করেছে, কারণ দূরদূরান্ত থেকে মার্কেসের মাজারে মুরিদ ও ভক্তকুল আসতে শুরু করেছেন। এই মুরিদ ও ভক্তদেরকে কিছু সময়ের জন্য ধরে রাখার জন্য গ্রামটি ধীরে ধীরে সাজতে শুরু করেছে। তার এই সজ্জার জন্য বেছে নিয়েছে মার্কেসের শতবর্ষের উপন্যাস থেকে চরিত্রগুলোর নাম। যেন এক একটি চরিত্র এই আরাকাতাকা নামক নারীটির চুলের ক্লিপ। প্রাকৃত রূপ থেকে আরাকাতাকা কৃত্রিম হয়ে উঠছে। যদিও এই কৃত্রিমতার জন্ম দিয়েছে সাহিত্যের মহিমা। 

আরাকাতাকা বলতে আমার মধ্যে তিরিশ বছর আগে যে-আবেগ তৈরি করেছিল, এই এলাকাটি দেখার জন্য যে-ব্যকুলতার জন্ম হয়েছিল তার সন্ধান এই দরদালানে নয়, আমি তা পেয়েছি এখানকার মানুষের সেই অনাড়ম্বর জীবন ও যাপনের সারল্যের মধ্যে। এই এলাকাটি সম্পর্কে আমার যত বেশি মোহভঙ্গ ঘটতে থাকে ততই আমি বিস্মিত হই এই ভেবে যে, এমন সাধারণ একটি গ্রাম থেকে অবিশ্বাস্য রকমের এক মহান লেখকের উত্থান হলো কী করে? মার্কেস যখন এই গ্রামটিতে জন্মগ্রহণ করেন তখন গোটা গ্রামটিতে কটাই-বা বাড়িঘর ছিল! লেখক ও মার্কেস-গবেষক রাফায়েল ধীরে ধীরে আমাদের সামনে আরাকাতাকার অতীত ও বর্তমান উন্মোচন করছেন। এই ভদ্রলোকই আমাদেরকে পরম আন্তরিকতায় গ্রহণ করলেন আরাকাতাকায়। মার্কেসের কারণে এই গ্রামটির অলিগলি, প্রতিটি রাস্তা, প্রায় প্রতিটি বাড়ি তার নিজস্ব ইতিহাস নিয়ে ধীরে ধীরে জেগে উঠছে। আমাদেরকে গ্রহণ করার পরপরই এরকম ইতিহাসের দুএকটি বলতে বলতেই নিয়ে গেলেন একটি রেস্তোরাঁয়। আমাদের গ্রামের ভাষায় ওটাকে চায়ের দোকান বলাই ভালো। কিন্তু ওদের চায়ের দোকান মানে খানিকটা মুদি-দোকান, খানিকটা খাবারের দোকান, আর খানিকটা বিয়ারের সরবরাহ। আনিস বলল, রাতের খাবারটা এখানেই সেরে নিতে। মনে হচ্ছে খাওয়ার জন্য এর চেয়ে ভালো কোনো জায়গা হয়তো আশেপাশে আর পাওয়া যাবে না।

রেলস্টেশনের পাশে রেস্তোরাঁয়

বিয়ারের ঠান্ডা আগুন তাপসের জমাটবদ্ধ স্তব্ধতার বরফ গলাতে শুরু করেছে। কৌতূহল নিয়ে তাকিয়ে দেখছে সে চারিদিক। কী যে খেয়েছিলাম, এ মুহূর্তে আমার মনে নেই। তবে খাবারটা আমার কাছে তেমন রসনা ধাঁধিয়ে দেয়ার মতো কিছু ছিল না।

খাবারের পাঠ চুকিয়ে আমরা যেখানে থাকব সেই হোটেলে গেলাম রাফায়েলের পিছু পিছু, হোটেলটি মোটামুটি হাটার দূরত্বেই ছিল। আরাকাতাকায় আমরা যখন গিয়েছিলাম, তখন আগস্ট। আর আগস্ট মানেই সেখানে মোটামুটি বেশ গরম। রাতের বেলা পৌঁছেছিলাম বলে গরমটা তখনও টের পাওয়া যায় নি, কিন্তু অনুমানে বোঝা যাচ্ছিল ওটা আমাদের এখানকার গরমের চেয়ে কম হবার নয়। এই গরমে রাতে ঘুম ঠিক হবে কিনা, সেটা নিয়ে আমি মনে মনে একটু দুশ্চিন্তায়ই ছিলাম আসলে। কিন্তু ‘Realismo Magico’ নামক অতিশয় সাধারণ হোটেলে ঢুকে যখন আমাদের কক্ষ দেখিয়ে দেয়া হচ্ছিল, তখন আমি বিস্মযে হতবাক! ওহ্‌ হো, তাহলে এসি আছে! গ্রামের চেহারা, দারিদ্র্য আর অর্থনৈতিক অবস্থা অনুমান করে ভেবেই নিয়েছিলাম হোটেলটিতে এসি থাকবার কথা নয়। কিন্তু আমাকে বিস্মিত করে দিয়ে এসির ব্যবস্থাও আছে! ম্যাজিক রিয়ালিজমই বটে।

হোটেলের নাম জাদুবাস্তবতা

যার যার কক্ষে ঢুকেই আমরা কাপড়চোপড় বদলে নিয়ে জড়ো হয়েছিলাম আনিসের কক্ষে। রাফায়েল বলছিল কিছুটা বিশ্রাম নিয়ে ইচ্ছে করলে আমরা রাতের আরাকাতাকাও দেখতে পারি। সে জন্যেই অনিসের রুমে গিয়ে আমরা জড়ো হয়েছি। কিন্তুু হঠাৎ করেই শান্তস্বভাবের তাপস রেগে গিয়ে আনিসকে বলতে শুরু করল, 'জায়গাটা এত ভয়ানক হবে জানলে আমি আসতাম না। তোমার  উচিত ছিল আমাকে আগেই এ ব্যাপারে ধারণা দেয়া।'

তাপসের এমন বিস্ফোরণে আনিস মোটেই প্রস্তুত ছিল না। বন্ধুত্বের সৌজন্য ভেদ করে আনিসের ব্যক্তিত্বে গিয়ে আঘাত করায় সেও একই রকম রাগত স্বরে বলল, 'তুমি এলে কেন? না এলেই পারতে? আমি তো তোমাকে জোর করে নিয়ে আসি নি।'

বুঝতে পারছি, এইভাবে চলতে থাকলে দুটো শিখাই ধাউ ধাউ করে আরও বেশি অগ্মিময় হয়ে উঠবে। আমাকে এর মধ্যে ঢুকতে হবেই। তাপস বাংলাদেশ থেকে আশির দশকেই চলে এসেছে মার্কিন মুল্লুকে। সেই থেকে সে এখানকারই বাসিন্দা। এক অর্থে মার্কিন সংস্কৃতিই তার সংস্কৃতি। এখানকার জীবনযাপনে তুলনামূলকভাবে নিরাপত্তাঘেরা যে-জীবন তাতে সে অভ্যস্ত। অন্যদিকে, কলম্বিয়া সাহিত্যের যত বড় বড় কুতুবের দেশই হোক না কেন, এটা তো আবার একই সাথে ড্রাগলর্ড, খুনখারাবি ও অপরাধের স্বর্গরাজ্যও। স্থানীয় কোনো বদ লোক যদি জানে যে এরা গ্রিংগো, নিদেনপক্ষে বিদেশি, তাহলে ডাকাতি রাহাজানি যে করবে না তারই-বা নিশ্চয়তা কী? সুতরাং তাপসের ভয়ের যথার্থ কারণ তো আছেই। কিন্তু আনিসও তো তাপসের মতোই, সেও তো বসবাসের সময়কাল হিসেবে করলে আনিস যতটা না বাংলাদেশি, তারচেয়ে বেশি মার্কিনি। ভয় তো আনিসেরও পাবার কথা। আনিসের ভয় পাওয়ার কথা আরও বেশি, কারণ সে শিল্পপতি।

কিন্তু দুজনের মধ্যে একটা বড় পার্থক্য এই যে একজন অভিযানপ্রিয়, অন্যজন্য নিরাপত্তাবলয়ে জীবনকে উপভোগের পক্ষপাতী। আমি এই দুয়ের কোনোটাই নই, কিন্তু দুজনকেই বুঝতে পারি। অতএব আগুন ছড়িয়ে পড়ার আগেই তা নিভিয়ে ফেলতে হবে।

'আনিস', যথাসম্ভব প্রেমের রসে চুবিয়ে নমিত কণ্ঠে বললাম, 'তোর  অভিজ্ঞতা দিয়ে সবাইকে দেখলে হবে না। তুই নানান দেশে ঘুরে বেড়ানো মানুষ। অভিযান তোর স্বভাবে। তাপস কিংবা আমি তো তা নই। সান্তা মার্তা থেকে সিয়েনাগা হয়ে আরাকাতাকা আসা পর্যন্ত ভয়টা কিন্তু আমারও ছিল। কলম্বিয়া তো সব সাধুসন্তের দেশ নয়, ঘটনা তো কিছু একটা ঘটতেই পারত। আমার মনে হয় তাপসের কথায় তোর রাগ করা উচিত না।' আর, এবার তাপসের দিকে ফিরে, 'ওস্তাদ, এই জীবন—যত নিরাপত্তাবলয়ের মধ্যেই থাকুন না কেন—সবসময়ই অনিশ্চয়তায় ঘেরা। আপনি যখন জানছেন যে ভিন্ন এক দেশে যাচ্ছেন, তখন একে অভিযান হিসেবে নেয়াই ভালো। তাছাড়া, আমরা সেই বিপদসীমা পেরিয়ে এসেছি। অতএব, এ নিয়ে ভ্রমণের আনন্দটা মাটি না করাই ভালো। চলুন, আমরা রাতের আরাকাতাকা দেখে আসি।'

দুটো শিখাকেই বরফকুচি দিয়ে নেভানো হলো কোনোমতে। তাপস নিজে থেকেই আনিসকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠল, 'সরি বন্ধু, আমি একটু উত্তেজিত হয়ে তোমাকে রূঢ় ভাষায় কথা বলে ফেলেছি। কিছু মনে করো না।' 

আরাকাতাকা গ্রামের রাস্তা

একটু পরেই রাফায়েল এসে হাজির, 'চলুন, আপনাদেরকে এই এলাকাটা দেখিয়ে নিয়ে আসি।' যেহেতু এই এলাকা চিনি না, সুতরাং, যাকিছু আছে তা সবই আমাদের জন্য দেখার মতোই বটে। একটি-দুটি দোতলা বাড়িঘর থাকলেও বেশির ভাগই একতলা, এবং সেগুলো অতি সাধারণ, কোনোরকম নকশা (Plan) ছাড়াই, অনেকটা গৃহকর্তা বা গৃহকর্তীর পরিকল্পনায় গড়ে ওঠা। রাত প্রায় বারোটার কাছাকাছি, কিন্তু এখনও বিক্ষিপ্তভাবে লোকজনের চলাফেলা আছে। রাফায়েলসহ আমরা হাটতে হাটতে এগিয়ে যাচ্ছি আর রাফায়েল এক একটি সড়কের বর্ণনা দিয়ে যাচ্ছেন। মার্কেসের সময় কোনটা ছিল, কোনটা ছিল না, কিংবা তখনকার সড়কটি এখন কী নামে পরিচিত—এসবই বলছিলেন হাটতে হাটতে। এত কিছু জানলেন কী করে এই রাফায়েল? আনিসের সুবাদে ওনার সম্পর্কে শুধু এইটুকু জানি যে ইনি গাইড, কিন্তু মার্কেসের এত কিছু উনি জানেন যে ওটা কেবল কোনো গাইডের জানার কথা নয়। আনিসই পরে জানালো, ইনি মার্কেসগবেষক।

বেশ কিছুক্ষণ হাঁটার পর আমরা একটা বার-এ এসে পৌঁছুলাম। বেশ ছোট্ট আকৃতির, লোকজনে ভরে আছে। গান আর চেঁচামেচিতে এমনই অবস্থা যে একজন আরেকজনের কথা বলতে হলে চিৎকার করে না বললে শুনবার উপায় নেই। এই চিৎকার-চেঁচামেচি আমার একদমই পছন্দ নয়, দম বন্ধ হয়ে আসে। রাফায়েলকে বললাম, 'ভাইডি, এই ভিড় আর চেঁচামেচিতে কথা বলাই তো মুশকিল।'

রাফায়েল সঙ্গে সঙ্গে বারের একজনের সাথে কথা বলে বারের পেছনের একটি ফাঁকা জায়গায় বসার ব্যবস্থা করে দিল। সেখানে বসেই আমরা গোটা দুই বিয়ার খেলাম। কিন্তু বার দেখতে এসে বারের বাইরে এভাবে বসে থাকার কী মানে? তার চেয়ে বাইরে ঘুরে বেড়ানোই ভালো। কিংবা হোটেলে গিয়ে বিশ্রাম নেয়া আরও ভালো। তাছাড়া বারের কথা বাদ দিলে, রাতের বেলা এই গ্রামটিতে এখন আর দেখার কিছু নেই। আনিসকে বললাম, চল আমরা চলে যাই। হোটেলে গিয়ে ঘুমাই। সকালে উঠে গ্রামটা দেখব। রাফায়েলও দেখলাম আমার মতেই সায় দিলেন। আবারও হাঁটতে হাঁটতে হোটেলে ফিরে এসে টানা ঘুম। 

আনিস ভোরের পাখি বলে সবার আগেই উঠে সে প্রস্তুত হয়ে আমাদেরকে জাগাতে এসেছে। আমি ঘুমকাতুরে বলে উঠি উঠি করে আরও কিছুক্ষণ বিছানায় পড়ে থাকলাম। পরে আনিসের পীড়াপীড়িতে আবার উঠতে হলো। হোটেল-মালিক একটি রেস্তোরাঁও রেখেছে হোটেলের পেছনে একটি বাগানের পাশে। বাগানটা হওয়া উচিত ছিল হোটেলের সামনে, কিন্তু কী কারণে এটা যেন পেছনে অদৃশ্য অবস্থায় আছে। নাস্তা হিসেবে কী পরিবেশন করা হয়েছিল এখন আর মনে নেই, নোট করেও রাখি নি। তবে নাস্তাটা যে বেশ সুস্বাদু হয়েছিল—এটুকু ঠিকই মনে আছে। সকাল তখন নয়টা বা সাড়ে নয়টার মতো হবে। রোদের সাবানে ধোওয়া চারপাশ ঝকঝক করছে। মালিক ও তার স্ত্রী আমাদেরকে খাবারে সঙ্গ দিচ্ছিলেন। হোটেল নয়, যেন এদের পারিবারিক মেহমান হয়ে এসেছি। নানানরকম কৌতুকরসে নাস্তা-পর্বটি স্মরণীয় হয়ে আছে এখনও। আনিস তার দোতারা নিয়ে গিয়েছিল সঙ্গে করে। তাদের অনুরোধে আনিস দোতরা বাজিয়ে শোনালো। ওরা আমাদের কথা যতটা উপভোগ করেছে তার চেয়ে এই দোতরার বাদনটা উপভোগ করেছে বেশি। 

হোটেল জাদুবাস্তবতায় দোতারা বাজাচ্ছেন অনুবাদক, কথাসাহিত্যিক আনিসুজ্জামান

এরই মধ্যে রাফায়েল আজকের দিনের পরিকল্পনা অনুযায়ী চলে এসেছে হোটেলে। পরিকল্পনা হচ্ছে আমাদেরকে এই গ্রামের পথঘাটগুলো একটু ঘুরিয়ে দেখানো আর শেষমেষ যে-বাড়িতে মার্কেসের জন্ম হয়েছিল সেটা দেখানো। রাফায়েল আমাদেরকে একটা পার্কের কাছে নিয়ে গেলেন। ওখানে আমরা বসে বসে তার কাছ থেকে মার্কেসের ঘটনার অনেক খুঁটিনাটি শুনলাম। আঙুল উঁচিয়ে আমাদের তিনি দেখালেন মারিয়া মন্তেসসোরি নামের একটি স্কুল, যেটি মার্কেসের প্রথম বিদ্যাপীঠ। দেখতে এমন কিছু আহামরি নয়। এখন যাও একটু সংস্কার ও আয়তন বাড়িয়ে একটু বড়সর ও সুদর্শন করা হয়েছে, তখন তো এটি আরও সাধারণ ছিল, যেমনটা আমাদের বহুকাল আগের গ্রামের স্কুলগুলো ছিল।

মার্কেসের বাড়ির সামনে

রোদ ধীরে ধীরে তেতে উঠছে দেখে আমরা মার্কেসের বাড়ির দিকে রওয়ানা হতে শুরু করি। ওই বাড়িতে ঢুকতেও নাকি দর্শনী দিতে হয়। হায় রে মার্কেস, আপনি এতই বিখ্যাত হলেন, এখন গাঁও-গেরামে আপনার সাধারণ বাড়িটি দেখতেও নজরানা দিতে হয়। নজরানা দিয়ে ঢোকার সময় আমাদের প্রবেশপত্র দেখার জন্য ঈষৎ কালো বর্ণের এক তরুণ মেয়েলি ভঙ্গিতে আমাদের প্রবেশপত্র দেখে ঢুকতে দিলেন। বাড়ি যদিও বলছি, এখন স্মৃতিশালা, তাই নজরানা ধার্য করা হয়েছে। আর এর যেহেতু পরিচর্যা ও লোকবল রয়েছে, ফলে তাদের ভরনপোষণের ব্যাপার তো আছে। কালো রঙের একটি অল্পবয়সী সুদর্শনা আমাদেরকে ঘুরে ঘুরে সব দেখাচ্ছিল আর প্রতিটি জিনিসের সাথে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছিল। বাড়িটার সামনে এবং পেছনে রয়েছে উন্মুক্ত জায়গা। জন্ম হওয়ার পর মার্কেসকে যে দোলনায় রাখা হতো, সেটি এখনও সুরক্ষিত আছে দেখে আমি একটু বিস্মিত হলাম। এই দোলনায় সম্ভবত তার অন্য ভাইবোনরাও একইভাবে আশ্রয় পেয়েছিল। যাবতীয় তৈজসপত্র এখনও অক্ষত আছে। আমাদের দেশে অজপাড়াগাঁয় তো দূরের কথা, শহরাঞ্চল হলেও এর কিছুই সুরক্ষিত থাকত না, তা সে যত বড় খ্যাতিমানই হোন না কেন। আমরা এদের তুলনায় ঐতিহ্য ও সংরক্ষণবিমুখ এক জাতি। 

মার্কেসের বাড়ির ভিতর

রাফায়েল আমাদেরকে এর পরে আরাকাতাকা রেলস্টেশনে নিয়ে গেলেন। ততক্ষণে দুপুর গড়িয়ে বেলা একটা-দেড়টা বেজে গেছে। সবটা পথ হেঁটে হেঁটে যাওয়ার কারণে বেশ খানিকটা ক্ষুধার্ত আমরা সবাই। খাবার খেতে আবার কোথায় যেতে হবে কে জানে? তাছাড়া সেটা এই স্টেশন থেকে কত দূর তাই-বা কে জানে। কিন্তু রাফায়েল আমাদেরকে অভয় দিয়ে বললেন, চিন্তা করো না, আমিগোস। দূরে কোথায়ও যেতে হবে না। কেন? তাহলে কোথায় রেস্তোরাঁ? কাছেই—জবাব দিলেন রাফায়েল। বাহ, তাহলে বাঁচা গেল। রাফায়েলের পরামর্শ হচ্ছে, যদি খেতেই হয় তাহলে এক্ষুনি অর্ডার দিয়ে দাও কী খাবে। কারণ খাবারগুলো তৈরি করতে খানিকটা সময় তো লাগবেই। এই ফাঁকে তোমাদেরকে স্টেশনের ওই পাশটা ঘুরিয়ে নিয়ে আসি। ও পাশটায় কী এমন আছে যে দেখতে হবে? আমি তো কয়েকটি একতলা বিধ্বস্ত ভবন আর তারই ফাঁকে ফাঁকে কযেকটি বাড়ি দেখতে পাচ্ছি। না বন্ধু, রাফায়েল হেসে বললেন, কিছু ইতিহাস, যার ইঙ্গিত কেবল আছে ওই শতবর্ষের নিঃসঙ্গতায় আর বাকিটা এখানে তুষের আগুনের মতো নিচে লাল হয়ে আছে, তোমার কৌতূহলী ফুঁয়ের মাধ্যমে তা আবার জ্বলে উঠবে। তাই নাকি! বেশ তাহলে দেখাই যাক কী আছে ওখানে।

মার্কেস-গবেষক ও গাইড রাফায়েলের সঙ্গে

নির্দিষ্ট দূরত্ব অনুযায়ী এক-একটি একতলা বাড়ি, কিন্তু এখন পরিত্যক্ত, বহুদিনের অবহেলায় এখন তা ভূতুড়ে চেহারা নিয়েছে। জানালা-কপাট কিছুই নেই। কিন্তু একসময় এই বাড়িগুলোতো থাকত কলাচাষের মালিকদের নিয়োগপ্রাপ্ত বিদেশি কর্মচারীরা। তখনকার দিনে বাড়িগুলো ছিল গোটা আরাকাতাকায় একমাত্র দালান বা পাকা বাড়ি। স্থানীয়দের কাছে এসবই হয়তো তখনকার দিনে প্রাসাদসম। কিন্তু দালানগুলোতে থাকতে রক্ত ও শ্রমচোষা মনিবেরা। মার্কেসের জন্মের পরের বছরই কলাচাষীদেরকে ধর্মঘটের কারণে যে নিধনযজ্ঞ চালানো হয়েছিল সেই খুনের রক্ত এই মনিবদের হাতেও লেগে আছে নিশ্চয়ই, যদিও এই হত্যাকাণ্ড হয়েছিল সিয়েনাগার রেলস্টেশনে, কিন্তু আরাকাতাকা থেকে তা বেশি দূরে নয়। দূরে যে নয়, তার এক উদাহরণ হচ্ছে এই যে মার্কেসের পিতামহ কর্নেল নিকোলাস মার্কেস নিজে এই ধর্মঘটের অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছেন। আরাকাতাকার এই ইতিহাসটা জানা থাকলে মার্কেসের রাজনৈতিক হয়ে ওঠা আর সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বিশ্বাস করার কারণ ও উসৎগুলো চিহ্নিত করা সহজ হয়ে যাবে। বাড়িগুলো এখন পরিত্যক্ত, কঙ্কালের মতো দাঁড়িয়ে আছে। আনিস কয়েকটি ছবি তুলে নিল ওর দামি ক্যামেরায়। তাপস আর আমি কেবল চোখের ক্যামেরায় তুলে নিয়েছি। 

'অর্ডার দেয়া খাবার নিশ্চয়ই এরই মধ্যে প্রস্তুত হয়ে আছে?'—রাফায়েলের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলাম। 'হ্যাঁ, মনে হয় ইতিমধ্যে প্রস্তুত হয়ে আছে, চলো আমরা ওখানে যাই।'

আমরা রেলস্টেশনের লাগোয়া রেস্তোরাঁয় ফিরে উন্মুক্ত এক গোলটেবিল নিয়ে বসলাম। রোদ থেকে বাঁচার জন্য উপরে বৃহদাকার একটি ছাতা। গরমে গলা শুকিয়ে আছে সবারই। 'খাবারের অবনতির জন্য গলাটা পিচ্ছিল করা দরকার, কী বলিস আনিস?' ওয়েটার ভদ্রলোক সামনেই ছিলেন, আমাদের অর্ডার নেয়ার জন্য। এই গরমে বিয়ারই হচ্ছে উত্তম। ভদ্রলোক ঠাণ্ডা বিয়ার দিয়ে গেলেন আমাদের চার জনের জন্য। মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই চলে এল দুই রকমের মাছের আইটেম। খাবারটা সত্যিই খুব সুস্বাদু হয়েছিল। রাফায়েলকে ধন্যবাদ জানালাম এরকম একটি রেস্তোরাঁয় আনার জন্য।

[চলবে]

রাজু আলাউদ্দিন

রাজু আলাউদ্দিন

জন্ম ১৯৬৫, শরিয়তপুরে। লেখাপড়া এবং বেড়ে ওঠা ঢাকা শহরেই। কর্মজীবনের শুরু থেকেই...বিস্তারিত

এই লেখকের সব লেখা