ওস্তাদ কারিগর এজরা পাউন্ড্-এর জন্য
১. মৃতের সৎকার
ক্রূরতম মাস এই এপ্রিল, গজিয়ে লাইলাক বন্ধ্যা এ-জমিনেতে, মিশিয়ে ঈপ্সার সাথে স্মৃতি, চেতিয়ে বাসন্তী বর্ষণে শুষ্ক শিকড়। আমাদের ওমে-ওমে রেখেছিল শীত, ঢেকে দিয়ে ধরণি বিস্মরণী তুষারের লেপে, ভুঞ্জিয়ে শুকানো কন্দে যৎসামান্য প্রাণ। গ্রীষ্ম তো বিস্মিত করেছিল আমাদের, এসে স্টার্ন্বার্গার্জেতে একটা পশলা নিয়ে; থম্কে থেমেছিলাম স্তম্ভ-শ্রেণিতে, হফ্গার্টেনে হেঁটে গেছি রোদ্দুরে, কফি-পান, আলাপন ঘণ্টাখানেক আলাপন। আমি রুশ নই, লিথুয়ানিয়া-ফেরতা আমি খাঁটি জর্মন। আমরা যখন শিশু, ছিলাম রাজকুমার—মামাত দাদার বাড়ি, আমাকে সে বেড়াতে নিয়েছে স্লেডে দূরে, এবং আমার কী-যে ভয় করছিল। দাদা বলেছিল, মারি, মারি, ঠিক মতো ধরো। আর নীচে নেমে গেছি আমরা দু’জন। পর্বতে সকলেই যদৃচ্ছাচারী। পড়ি রাত জেগে জেগে, দক্ষিণে চ’লে যাই শীতে। কী এই শিকড়গুলি, যা মাটি খাম্ছে ধরে, এ-শাখারা, যারা বাহু প্রসারিত করে এ-পাথুরে জঞ্জালে? মানবতনয়, তুমি না-পারবে কিছু বলতে, করতে কোনো অনুমান, যেহেতু তুমি তো চেনো শুধু কতগুলা ছিন্ন ছবির ডাঁই, সূর্য যেথায় চাবুক চালায়, আর মরা গাছ ছায়াতল দেয় না, ঝিঁঝিরা দেয় না বিরাম, আর দেয় না পাথর মিঠে পানির আওয়াজ, শুধু ছায়া আছে এই লাল পাহাড়ের তলে, (এসো লাল পাহাড়ের ছায়ার তলায়), তোমার যে-ছায়া ভোরে দীর্ঘ পদক্ষেপে পিছু ধায় অথবা যে-ছায়া জাগে তোমার অন্বেষণে সন্ধ্যায়, তোমাকে দেখাব আমি ভিন্ন যা দু’টির থেকেই: তোমাকে দেখাব ভীতি একমুঠি ধুলার ভিতরে। তাজা হাওয়া বয় খুঁজিয়া দেশের ভুঁই, ও মোর বিদেশি জাদু, কোথায় রহিলি তুই? “আমাকে প্রথমবার দিয়েছিলে কুবলয় এক সাল আগে; আমাকে ডাকত ওরা কুবলয়বালা।” তবু, বিলম্বে, দোঁহে ফিরেছি যখন সেই বাগানের থেকে ভর্তি তোমার হাত, ভেজা চুল, কথা কইতেই পারি নি, আমার চোখ হ’ল নিষ্প্রভ, আমি না-জীবিত না-মৃত, এবং আমি জেনেছি ‘কিছু-না’, আলোকের আত্মায় তাকিয়ে দেখেছি, নীরবতা। ভ্রষ্ট নষ্ট এক নিধুয়া পাথার মাদাম সোসোস্ত্রিস, যশোমতী গনৎকারিণী, সর্দিতে কাবু হয়েছিলেন, তথাপি এও ঠিক, মনীষায় ইয়োরোপে অগ্রগণ্যা বটে তিনি, সাথে এক অপয়া তাসের তোড়া, তিনি ফর্মান, এই যে তোমার তাস, ফিনিসিয় মগ্ন নাবিক, (মোতি হ’য়ে গেছে যারা চোখ ছিল তার, দ্যাখো!) আর এই বেলাডোনা, পর্বতরূপসী, অঘটনঘটনপটীয়সী। এই যে ত্রিশূলপাণি লোকটি, এই সে-চক্র, এ একচোখো বণিক্টি, আর এই তাসখানি বিলকুল ফাঁকা, বোধ হয়, যা-কিছু সে পিঠে চলে ব’য়ে, যা আমার দেখতে বারণ। আমি দেখতে না পাই ফাঁসি-দেওয়া লোকটিকে। সলিলসমাধি-যোগ আছে, হুশিয়ার! দেখছি লোকের ঢল অগণিত, দ’য়ে এক হাঁটছে সবাই। অনেক ধন্যবাদ। শ্রীমতী একুইটোন যদি দেন দেখা, বোলো তাঁকে, ঠিকুজিটা নি’আসব নিজে: এদানি সবারই খুবই হুশিয়ার থাকা দরকার। অলীক শহর খয়েরি কুয়াশা-মোড়া শীতের সকালে, হাজারো লোকের ঢল ব’য়ে চলে লন্ডন ব্রিজে, অগণিত, কখনও ভাবি নি আগে মৃত্যু করেছে নাশ এত অগণিত। দীর্ঘশ্বাস পড়ে, ছোট-ছোট, ও অনিয়মিত, পায়ের সামনে রাখে দৃষ্টি সকলে। চড়াইয়ে চড়ল স্রোত, নেমে গেল পুনরায় কিং উইলিয়াম সরণিতে যেখানে সাধ্বী মেরি উলনথ গুনছে প্রহর নয়টার শেষ মৃত ঘণ্টা-ধ্বনিতে। চেঁচাই একটা পরিচিত মুখ দেখে, ‘ওহে স্টেট্সন! ‘মাইলিতে তুমি ছিলে না কি, ভাই, আমার জাহাজ-সাথি? ‘গেল-বার তুমি তোমার বাগানে পুঁতেছ যে-মুর্দাটি ‘মুকুলিত ওটি হচ্ছে তো? হবে পুষ্পিত কি এ-সন? ‘না তার কেয়ারিটিকে তছনছ করেছে সহসা শীত? ‘আঃ! খেদাও এখান থেকে ও-কুকুর, মানুষের ও সুহৃৎ, ‘তা নইলে নখে খুঁড়ে ও যে তাকে উপড়ে ফেলবে পুনর্বার! ‘কপট পাঠক, দোসর, যমজ ভাই আমার!’২. এক দান দাবা
রমণী যে-কেদারায় সমাসীনা, চকচকে তখতের মতো ঝলকিত মর্মর-মেঝেতে, যেথা কনকমুকুর বিলম্বিত খুঁটিতে, উৎকীর্ণ যাতে ফলবন্ত—দ্রাক্ষাকুঞ্জ, মধ্যে থেকে তার কুতূহলে উঁকি মেরে রয়েছে সোনার বালমদন জনেক (অন্য একজন চোখ লুকিয়ে রেখেছে তার পাখার পালকে); মুকুরে দ্বিগুণ-করে সপ্তশাখ ঝাড়বাতিসমূহের শিখা টেবিলে বিম্বিত হয়, যেথা তার অতীব মহার্ঘ গহনার রতনসম্ভবা বিভা অগ্নিপ্রতিভার সাথে মিশে একাকার সাটিন-পেটিকা থেকে ঝ’রে পড়ে যে-প্রতুল ঐশ্বর্যসম্ভার; ছিপিমুক্ত, হাতির দাঁতের আর বর্ণালিম কাচের শিশিতে তার ঐ অত্যাশ্চর্য কৃত্রিম সুগন্ধিগুলি আছে ওৎ পেতে: মলম, তরল কিংবা চূর্ণ—ত্যক্ত করে, দ্বিধান্বিত করে, আর চেতনা নিমগ্ন হয় পরিমলে, যা ক্রমে উত্থিত ঊর্ধ্বলোকে বাতায়ন-সঞ্চারিত বিমল হাওয়ায় প্রলম্বিত মোমশিখা ক’রে পীনতর, তাদের ধোঁয়াকে ছুড়ে লাকুয়ারিয়ায়, সিলিঙের কারিকুরি আন্দোলিত ক’রে। তাম্রলিপ্ত সুবিশাল সামুদ্রিক কাঠ সবুজ, কমলা রঙে উজ্জ্বলন্ত—ফ্রেমে বাঁধা রঙিন পাথরে, করুণ আভায় তার সন্তরণরত এক খচিত শুশুক। প্রাচীন ধাঁচের এক ম্যান্টেলের ’পরে গবাক্ষ গিয়েছে খুলে যেন সেই আরণ্যক দৃশ্যের ভিতরে ফিলোমেল বিবর্তিত হয়েছে যেখানে, সেই বর্বর রাজার রুক্ষতায়; তবু ঐ বুলবুলি ভরেছে ওখানে অবারিত কাকলিতে তামাম বিরান, এখনও সে কাঁদে, আর এখনও দুনিয়া তার পিছু ধায়, আর তার গান “চুক চুক” অপবিত্র কানে। পরন্তু হতশ্রী বহু উৎক্রান্ত কালের অভিজ্ঞান উৎকলিত দেয়ালের গায়ে; নিষ্পলক প্রতিমা প্রচুর নমিত, নময়মান, রুদ্ধকক্ষে হেনে তূষ্ণীম্ভাব। ইতস্ততঃ পদধ্বনি রণিত সোপানে। অগ্নিপ্রতিভার নীচে, চিরুনির নীচে, সেই নারীর চিকুর আলুথালু উজ্জ্বলন্ত যেন-বা শিখায় সবাক্ দ্যুতিতে, হবে পুনশ্চ নিশ্চুপ রুক্ষতায়। ‘আজ রাতে স্নায়ুরা দুর্বল, বেশ দুর্বল, আজকে সাথে থাকো। কিছু বলো। কেন কিছু বলছ না? বলো। কী ভাবছ? কোন্ ভাবনা? কী? কিছুই বুঝি না কী-যে ভাবো। ভাবো।’ মনে হচ্ছে ইঁদুর-গলিতে আমরা থাকি খোয়া গেছে হাড়গুলি যেথা মৃতেদের। ‘ও কীসের গোলমাল? দরজার নীচে বাতাসের। ‘এখন কীসের শব্দ? কী করছে বাতাস?’ কিছু-না, বিলকুল কিছুই-না। ‘কিছু-না জানো কি তুমি? দ্যাখো কি কিছু-না? মনেও পড়ে কি কিছু-না-ই?’ মনে পড়ে মোতি হ’য়ে গেছে যারা চোখ ছিল তার। ‘তুমি বেঁচে আছো তো, না নাই? খুলিতে কি বিলকুল কিছু-না?’ কিন্তু উ উ উ উ শেক্স্পিহিরিয় ঐ খেমটা-খেউড় কী অপূর্ব ও যে কুশলী কত যে ‘এখন কী করব আমি? কী করব আমি? এ-হালেই বেরিয়ে পড়ব, হেঁটে বেড়াব রাস্তায় না-হয় খোলা-চুলেই। কিন্তু কালকে কী করব আমরা? আদৌ কী করব আমরা?’ দশটায় গরম পানি, বৃষ্টি হ’লে ঢাকা-গাড়ি চারটার দিকে। আর, আমরা খেলে নেব এক দান দাবা অপলক চোখ রেখে দরজায়, কড়া-নাড়া শোনার আশায়। লিলের বরের চাকরি চুকে গেলে ওকে বলেছিলাম তখন, রেখে-ঢেকে থোড়াই—নিজেই ওকে বললাম, শোন্— জ ল দি স ম য় না ই অ্যাল্বার্ট্ অ্যাদ্দিন বাদে ফিরে আসছে, এখন একটু হ চৌকস। দাঁতের জন্যে যে-টাকা দিয়েছিল, এসেই তো তার হিসাব চাইবে। সে তো দিয়েছিল ঠিকই। আমার সামনেই। ওগুলি নিকাল, লিল, নোতুন একটা সেট কিনে নে এবার। ও বলেছে, মাইরি বলছি, আর তোমার মুখের দিকে তাকাতে পারি না। আমিও পারি না, আমি বললাম, বেচারা অবিনাশের কথাটাও ভেবে দ্যাখ্ দিকি: সমরবিভাগে আছে চার সাল, ফিরে কিছু রসকষ চাইতেই পারে, বলি, তুই না-ই দিস যদি, অন্য কেউ দেবে। বটে? ও বলল। আমি বললাম- নয়তো কী আর। তবে জানব ধন্যবাদ দিতে হবে কাকে, ও বলল, আমার দিকে তাকা... জ ল দি স ম য় না ই পছন্দ না-হ’লে তুই এম্নি চালিয়ে যা গে, বললাম তাকে, তুই না-পারলে অন্যে ক’রে দিতে পারবে বাছাই। বলার কমতির জন্য হবে না তা, অ্যাল্বার্ট্ বিগ্ড়ে যদি যায়ই। শরম-কি বাত, বলি, যেরকম গেছিস বুড়িয়ে (অথচ ও মোটে একত্রিশ)। কিছুই করার নেই, মুখ কালো ক’রে ও বাতায়, ঐ গর্ভপেতে বড়িগুলোকেই এ-বাবদে দায়ী করা যায় (এযাবৎ পাঁচখানা- মরতেই বসেছিল জর্জ্ হ’তে গিয়ে)। কোনো ভয় নাই, বলেছিলেন কেমিস্ট্, ঐ পর্যন্ত। তুই একটা নিখাদ গর্দভ—আমি কই, অবশ্য অ্যাল্বার্ট্ তোকে না-ছাড়ে তো কীইবা এমন... ছেলেপুলে না-চাইলে বিয়ে করা কেন? জ ল দি স ম য় না ই অ্যাল্বার্ট্ ঘরেই ছিল রোববার, করেছিল গরম গ্যামন, ডিনারে আমাকে ওরা ডেকেছিল চেখে দেখতে, হয়েছে কেমন— জ ল দি স ম য় না ই জ ল দি স ম য় না ই বিল শুভরাত, শুভরাত লু, মে শুভরাত। শুভরাত। টা টা। শুভরাত। শুভরাত। শুভরাত মাসকল। শুভরাত সুন্দরী মেয়েরা। শুভরাত। শুভরাত।৩. অগ্নিস্তোত্র
নদীর শিবির ভেঙে গেছে: পাতাগুলি শেষ ক’টি আঙুলে খাম্ছে ধ’রে তলায় নদীর ভেজা পাড়ে। বইছে সমীরণ খয়েরি জমির ’পর, অশ্রুত। অপ্সরারা সবাই অন্তর্হিত। সুন্দরী টেম্স্, যাও ব’য়ে ধীর আমার গান না থামছে যতক্ষণ। নদীতে ভাসে না কোনো খালি বোতল, মেঠাই মোড়ার রাংতা, রেশমি রুমাল, বেতের টুকরি, বিড়ির টুকরা কিংবা নিদাঘ-নিশির অন্য কোনো সাক্ষিসাবুদ। অপ্সরারা সবাই অন্তর্হিত। এবং তাদের বন্ধুবর্গ, নগর-অধিকারিগণের চাল-চুলা-হীন যত ওয়ারিশান, অন্তর্হিত, ঠায়-ঠিকানা-বিনা। লেমানের জলের ধারে বসেছি, আর কেঁদেছি কত... সুন্দরী টেম্স্, যাও ব’য়ে ধীর আমার গান না থামছে যতক্ষণ। বও ধীরে বও, কারণ উচ্চ কিংবা দীর্ঘ নয় এ-উচ্চারণ। কিন্তু আমার পিছে শুনি হিমেল হাওয়ার একখানা ঝাপ্টাতে খুটুর-খুটুর হাড্ডি বাজে, চাপাহাসির কানাকানি ছড়িয়ে যায় তাতে। গাছগাছালির ভিতর দিয়ে একটা ইঁদুর ছেঁচড়ে চ’লে যায় কাদা-মাখা পেটটুকু তার ঘষ্টে পারঘাটায় আমি যখন ঘুরে-ঘুরে মাছ-শিকারে রত গ্যাস হাউসের পিছনে এক শীতের সন্ধ্যারাগে স্মরণ ক’রে রাজা—আমার ভাইয়ের ভরাডুবি এবং রাজা—আমার পিতার মৃত্যু তারও আরও আগেভাগে। ভেজা নামো জমির উপর সাদা নাঙ্গা দেহ, এবং খুবই ছোট্ট নিচু খটখটে এক চিলেকোঠায় রেখে দেওয়া হয়েছে সব হাড়, বছর-বছর ইঁদুর চলার শব্দ-ছাড়া অন্য কিছুই নাই। কিন্তু আমার পিছে আমি শুনি হামেশাই মোটর এবং ভেঁপুর শব্দ, শ্রীমতী পোর্টারের পাশে সুইনি-কে যা নিয়ে আসবে মধুমাসে। উজল-উজল চাঁদের আলো ঝরেছিল, আহ্, শ্রীমতী পোর্টারের এবং কন্যার উপর তাঁর, পা ধুতে যে করেন তাঁরা সোডা ব্যবহার, এবং অহো, গম্বুজে ঐ বাচ্চাগুলির গীতল গলার রা! পিউ পিউ পিউ চুক চুক চুক চুক চুক চুক কী রুক্ষতায় বাধ্য। তেরিউ অলীক শহর শীতের খয়েরি কুয়াশায় মোড়া দ্বিপ্রহরে স্মার্নার পনি, জনাব য়ুগেনিদিস, মুখ-ভরা তার খোঁচা-খোঁচা দাড়ি, জেব-ভরা কিসমিস সি.আই.এফ. লন্ডন: সব দলিলপত্র জোগাড় ক’রে গেঁয়ো ফরাসিতে দিলেন দাওয়াত বণিক্প্রবর মধ্যাহ্নভোজনের জন্যে ক্যানন স্ট্রিট হোটেলে, তার পর সাপ্তাহিক ছুটিটা কাটাতে মেট্রোপোলে। যে-বেগনি প্রহরে দু’চোখ, পিঠ টেনে তোলা হয় ডেস্ক্ থেকে, অপেক্ষিত মানুষ-কলে-রা যে-সময় অপেক্ষায় দুরুদুরু ট্যাক্সির মতন কম্প্র, আমি, অন্ধ তিরেসিয়াস, ত্রিশঙ্কু দু’টি জীবনের মাঝে, নারীর কুঞ্চিত কুচ-যুক্ত এক বৃদ্ধ, অন্তর্যামী, দেখি এই বেগনি প্রহরে, এই ঘরে-ফেরা সাঁঝে, নাবিক সৈকতে ফেরে যে-সময়, চায়ের সময়, টাইপিস্ট্ মেয়েটি ঘরে। এঁটোকাঁটা সাফসুতরা করে ব্রেকফাস্টের, চুলা জ্বালে, টিনের খাবার সমুদয় সাজায় গোছায়। মেলে দেওয়া আছে জানালার ’পরে আঙ্গিয়া-জাঙ্গিয়া, প্রায়-শুকনা; ছুঁয়ে অস্ততপনের শেষ রশ্মি। ডিভানে (যা রাতে শয্যা ওর) ডাঁই হ’য়ে কাঁচুলি শেমিজ মোজা চটি। কোঁচকানো ওলানের বুড়া, তিরেসিয়াস, দেখেছি ঐ দৃশ্য ভয়ে-ভয়ে, অবশ্য আংশিকভাবে, বাকিটা গণনা ক’রে বলা— প্রত্যাশিত অতিথির জন্যে ব’সে ছিলাম আমিও। সে-যুবক এসে গেল, কুশ্রী গাল, কার্বাঙ্কল-অলা, ছোট হাউস এজেন্টের করণিক। উদ্ধত অপ্রিয় দৃষ্টি তার। অধস্তন একজন, ঘাড়ে আছে ব’সে আস্থা যার, ব্র্যাড্ফোর্ড্ ক্রোড়পতিদের মুণ্ডোপরি রেশমি টুপির মতো। সময় প্রশস্ত, ভাবল সে, খাওয়া শেষ, মেয়েটি বিরক্ত আর ক্লান্ত, তড়িঘড়ি শরীরী সোহাগে ছেলে মেয়েটিকে চাইল তাতাতে, ভালো যদি না-ও লাগে, মেয়েটি সাধে নি বাদ তাতে। তড়িৎ-সিদ্ধান্তে দীপ্র, ঝাঁপাল যুবক ক্ষিপ্র রড়ে, অভিযাত্রী হাত দু’টি বাধাই পেল না কোনো তার; হাওয়াই দেমাক তার অপরের কী পরোয়া করে, উদাসীনতাকেই সে স্বাগতম্ ক’রে তোলে, (আর আমি, তিরেসিয়াস, সয়েছি পূর্বে একই মনোভার অভিনীত হচ্ছে যা এখন ঐ শয্যা বা ডিভানে; একদা বসেছি যবে থিবিসের প্রাচীরের তলে, হেঁটে গেছি নীচতম মৃতের ভিড়ের মাঝখানে।) বিদায়-চুম্বন হেনে উদাসীন এক অনুদানে হাতড়িয়ে পথ খুঁড়ে নিল, সিঁড়ি অন্ধকার ব’লে... মেয়েটি ঘুরল, একঝলক তাকাল আয়নায়, এইমাত্র অন্তর্হিত প্রেমিক-বাবদে নিশ্চেতন; মগজে ধোঁয়াটে এক ভাবের বাতাস ব’য়ে যায়: ‘যা হবার হ’য়ে গেছে—কী আসে বা কী যায় এখন।’ যখন রূপসী নারী পা বাড়ায় বোকামিতে, আর ঘরে ফিরে একা-একা পায়চারি করে আন্মনে, হয়তো আঁচড়ায় চুল স্বয়ঙ্ক্রিয় হাতটিতে তার, অতঃপর মর্জিমতো রেকর্ড চড়ায় গ্র্যামোফোনে। ‘এ-গান আমার সাথে পানির উপরে ভেসে এসেছিল ধীরে’ আর স্ট্রান্ড্ ধ’রে সোজা কুইন ভিক্টোরিয়া সরণিতে। ও শহর শহর, আমি যে শুনি প্রায়ই পাশে ব’সে গণপানশালার, লোয়ার টেম্স্ স্ট্রিটে, ম্যান্ডোলিনে বেজে ওঠে সকরুণ রুনুরুনু আর ঠকঠক বকবক মধ্যে থেকে তার যেখানে দুপুরে যত মৎস্যাজীব তোলে ক্লান্ত হাই; ম্যাগনাস মার্টারের বিরাট্ প্রাচীরে যেখানে আয়োনিয়ান মর্মর ও স্বর্ণের অবর্ণনীয় ঐশ্বর্য বোঝাই।তেল আলকাতরার ঘাম ঝাড়ে নদী বজরারা ছোটে ঘুরপাক সোঁতে বিতত রাতুল পাল অনুকূল বাতাসে দোদুল যত পৃথুল মাস্তুলে। বজরারা গা ধোয় ঘা মেরে ভাসন্ত গুঁড়ির, নিরবধি চ’লে যায় গ্রিনিচের কূলে আইল অব ডগ্জ্ ছেড়ে। হ্বাইয়ালালা লাইয়া হ্বালালা লাইয়ালালা
এলিজাবেথ ও লেস্টার ছলাচ্ছলাৎ ফেলছে দাঁড় ফুটে ওঠে পাছ-গলুই গিল্টি-করা শাঁখ লাল আর সোনালি ফুর্তি ফুলে ওঠে ঢেউ দুলিয়ে দুই কূলেই ছোটে বায়ুকোণের বায় ভাটিতে নে’ যায় ঘণ্টার ঢংকার কত শ্বেতমিনার হ্বাইয়ালালা লাইয়া হ্বালালা লাইয়ালালা
‘ট্র্যাম ও মলিন গাছ। হাইবেরি জন্মিয়েছে আর রিচ্মন্ড্ আর কিউ করেছে বিনষ্ট অকারণে। রিচ্মন্ড্ উপকূলে হাঁটু তুলেছিলাম আমার উত্তান শয়ান থেকে একটা ডিঙির পাটাতনে।’ ‘মোরগেটে পা আমার, এবং আমার হৃদয় পায়ের তলে। ঘটনাটি ঘ’টে গেলে পরে কাঁদল সে। শপথ করল এক নূতন শুরু-র। আমি আর মন্তব্য করি নি কোনো। ক্ষুব্ধ হ’ব কিসের উপরে?’ ‘মার্গেট বালিয়াড়িতে। আমি পারি জুতে দিতে কিছু-না-র সঙ্গে কিছু-না। আমার দেশের লোক, আপামর লোকজন, ইরাদা যাদের কিছুই-না।’ লা লা কার্থেজে আসিলাম তবে দহতে দহতে দহতে দহতে হে প্রভু উৎপাটন করহ আমায় হে প্রভু উৎপাটন করহ দহতে