২৫ আগস্ট ২০১৭ কবি আহমদ ফারাজের নবম মৃত্যুবার্ষিকী। আহমেদ ফারাজ ছিলেন জাতিতে পশতুন। ১৯৩১ সালের ১২ জানুয়ারি যার জন্ম।
আধুনিক উর্দু কবিতার প্রধানতম এক কবি ফারাজ। মূল নাম সৈয়দ আহমদ শাহ। আহমেদ ফারাজ নামেই লিখতেন তিনি। নয় বছর আগে ২৫ আগস্ট ৭৮ বয়সে মারা যান তিনি। কাকতালীয়ভাবে ২৫ আগস্টেই তার প্রধান কবিতার বই তানহা তানহা (একা একা) প্রকাশিত হয়েছিল।
ফারাজের কবিতার প্রধান বিষয়গত বৈশিষ্ট্য হলো রোমান্স এবং প্রধান ভাষাগত সৌন্দর্য হলো সারল্য। সেই একই কবির প্রধান সামাজিক বৈশিষ্ট্য ছিল সামরিক শাসনের সুদৃঢ় বিরোধিতা। পাকিস্তানের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে—যা বরাবর ছিল দুঃসাহসিক। যার কারণে জেনারেল জিয়া-উল-হকের শাসনামলে তাকে প্রথমে কারাগারে যেতে হয় এবং পরে দেশ ছাড়তে হয়। আবার পারভেজ মোশাররফের সামরিক শাসনের প্রতিবাদস্বরূপ তিনি ফিরিয়ে দিয়েছিলেন তার ‘হিলাল-ই-ইমতিয়াজ’ পদক। মৃত্যুর পর অবশ্য তিনি ‘হিলাল-ই-পাকিস্তান’ পদকও পেয়েছেন।
পশতু ও ফার্সি ভাষায় শিক্ষাজীবন শেষে ফারাজ কর্মজীবন শুরু করেছিলেন একজন রেডিও প্রডিউসার হিশেবে। পরে পেশোয়ারের একটি কলেজে শিক্ষকতাও করেন কিছু সময়।
রাজনৈতিক দ্রোহী মন এবং কাব্য প্রভাব—উভয় কারণেই তাকে তুলনা করা হয় উর্দুকাব্যের আরেক প্রধান চরিত্র ফয়েজ আহমেদ ফয়েজের সঙ্গে। মেহেদী হাসান, নূর জাহান থেকে লতা মুঙ্গেশকর পর্যন্ত উপমহাদেশের বিখ্যাত অনেক শিল্পীর কণ্ঠেই সৌন্দর্যের অনন্য সুষমা পেয়েছে ফারাজের গজলগুলো। এখনও নিয়মিতই যা গীত হয়ে চলেছে দক্ষিণ এশিয়ার সীমানা ছাড়িয়েও।
নবম মৃত্যুবার্ষিকীতে তাকে স্মরণ করে বাংলাভাষী পাঠকদের জন্য ফারাজের তিনটি গজল অনুবাদ করেছেন আলতাফ পারভেজ।
পয়াম আয়ে হ্যাঁ (বার্তা এসেছে) ❑❑
পয়াম আয়ে হ্যাঁ উস ইয়ার-এ-বেওয়াফা কে মুঝে জিসে করার ন আয়া কহী ভুলা কে মুঝে
বার্তা এসেছে সেই অবিশ্বাসীর আমাকে ভুলেও যে কখনো শান্তি পায় নি
জুদাইয়াঁ হো তো এইসী কি উমরো ভর ন মিলে ফরেব দো তো জরা সিলসিলে বড়া কে মুঝে
বিচ্ছেদ হলে এমনি হোক—জীবনভর আর দেখা না হলো ধোঁকা যদি দেবে—পরম্পরা ধরেই দাও
নশে সে কম তো নহী ইয়াদ-এ-ইয়ার কা আলম কি লে উড়া হ্যা কঈ দোষ পর হওয়া কে মুঝে
প্রিয়ার স্মৃতি যখন ভর করে—তখন নেশার মতোই দশা হয় মনে হয় কেউ একজন আমায় হাওয়ার কাঁধে নিয়ে উড়ছে
ম্যা খুদ কো ভুল চুকা থা মগর জঁহা ওয়ালে উদাস ছোড় গয়ে আঈনা দিখা কে মুঝে
ভুলেই গিয়েছিলাম নিজেকে; কিন্তু দুনিয়ার মানুষেরা আমাকে আয়না দেখিয়ে বিমর্ষ করে ছেড়ে দিল
তুমহারে বাম সে অব কম নহীঁ হ্যা রিফঅত-এ-দার জো দেখনা হো তো দেখো নজর ওঠা কে মুঝে
ফাঁসি-কাঠের চত্বর থেকে তোমার অলিন্দ কম ছিল না এবার দেখতে চাইলে চোখ তুলে আমাকেই দেখ
খিঁচি হুঈ হ্যা মেরে আঁসুওঁ ম্যাঁ ইক তসভির ‘ফারাজ’ দেখ রহা হ্যা ও মুস্কুরা কে মুঝে
আমার অশ্রুর মধ্যে এক ছবি আঁকা হয়ে আছে ‘ফারাজ’ সে আমায় দেখছে স্মিত হাসিমুখ নিয়ে
কিসমত কা সিকন্দও (বিজয়ীর ভাগ্য) ❑❑
মে তো মক্তল মে ভী কিসমত কা সিকন্দর নিকলা কুরআ-এ-ফাল মেরে নাম কা অফসর নিকলা
বধ্যভূমিতেও বিজয়ীর ভাগ্য আমার— হতভাগ্য নিহতদের লটারিতে বারবার আমার নামই থাকে সর্বাগ্রে
থা জিনহে জো’ম ঔ দরিয়া ভী মুঝি মে ডুবে ম্যা কি সহরা নজর আতা থা সমনুদর নিকলা
কূল হারা বিশালত্বে গর্বিত সে-ই সব নদীরাও আমার মাঝে হারিয়ে গেল যে আমাকে মনে হতো মরু—সেও দেখি আসলে সমুদ্র
ম্যা নে উস জান-এ-বহারা কো বহুত ইয়াদ কিয়া জব কোঈ ফুল মেরি শাখ-এ-হুনর সে নিকলা
বসন্তরূপী প্রাণপ্রতিমার কথা মনে পড়ে তখনি আমার কবিতার শাখায় যখনি কোনো ফুল ফোটে
শাহরওয়ালো কী মোহব্বত কা ম্যা কায়েল হু মগর ম্যা নে জিস হাথ কো চুমা ওহী খঞ্জর নিকলা
এ শহরের বাসিন্দাদের ভালোবাসায় কত না কৃতজ্ঞ আমি কিন্তু যে হাতেই চুমো খেয়েছি—সে হাতই ছুরির ফলা হয়ে ধরা দিয়েছিল
তু ওহী হার গয়া হ্যা মেরি বুঝদিল দুশমন মুঝ সে তনহা কে মুকাবিল তেরা লস্কর নিকলা
হে আমার কাপুরুষ শত্রু—ওখানেই হেরে গেলে তুমি একা আমাকে মোকাবেলা করতেও বাহিনী পাঠাতে হলো তোমাকে
ম্যা কি সহরা-এ-মোহব্বত কা মুসাফির থা ‘ফারাজ’ এক ঝোঁকা থা কি খুশবু কে সফর পর নিকলা
আমিও প্রেমের মরুভূমির পথিক ছিলাম ‘ফারাজ’ যেভাবে দমকা বাতাসে ফুলের গন্ধ সফরে বের হয়
আসুফতা খেয়ালি (ভাবনার পাগলামি) ❑❑
দিল-গরফতা হী সহী, বজম সজা লী জায়ে ইয়াদ-এ-জানা সে কোঈ শাম ন খালি জায়ে
হৃদয় কেউ আটকে রেখেছে সত্য, তবু আসর সাজানো যাক প্রিয়’র স্মৃতি রোমন্থন কোনো সন্ধ্যায় যেন বাদ না যায়
রফতা রফতা য়হী জিন্দান সে বদল জাতে হ্যায় অব কিসি শহর কী বুনিয়াদ না ডালি জায়ে
একটু একটু করে এটাই কারাগার হয়ে ওঠে নতুন কোনো শহরের ভিত্তি স্থাপন না নয়
মুসরফ-এ-রুখ হ্যা কিসি কা কি বয়াজ-এ-হাফিজ এসে চেহরে সে কভী ফাল নিকালী জায়ে
কারো কারো পবিত্র মুখ যেন হাফিজের কবিতা সংগ্রহের মতো যে মুখ দেখে অনুমান করা যায় ভবিষ্যৎ-ও
ও মুরব্বত সে মিলা হ্যা তো ঝুকা দু গরদান মেরে, দুশমন কা কোঈ ওয়ার ন খালি যায়ে
সে যদি শিষ্টতার সঙ্গে আসে—ঘাড় ঝুঁকিয়ে দেবো চাই আমার দুশমনের কোনো আঘাতও যেন ব্যর্থ হয়
বে-নওা শহর কা সায়া হ্যা মেরে দিল পে ‘ফারায’ কিস তরহ সে মেরী আসুফতা খেয়ালি জায়ে
হৃদয়ে আজ সুরহীন শহরের ছায়া, ‘ফারাজ’ কেমন করে ভাবনার পাগলামি যাবে, বলো?