তাই তো আমায় জাগিয়ে রাখ

তথ্যপুঞ্জ থেকে কোনো কূলকিনারা মেলে না সত্যের—কোথায় যেন শুনিয়াছিলাম এমন একটি লাইন। সত্যই বা কী, আর কোথায়ই-বা তাহার কিনারা তাহাও কি থোড়াই জানা আছে নাকি আমাদের! তবু ঘটনার পিছু ধরিবার নেশাতে আমরা সকলেই কিছুদূর গোয়েন্দা হইয়া উঠি। মাথায় টুপি বা ঠোঁটে পাইপ না-গুঁজিলেও, হাতে আতশ কাচ লইয়া অকুস্থলের এদিক সেদিক ঘোরাঘুরি করিয়া আমরাও হয়তো রাজ্যের নিদর্শন জোগাড় করিয়া ফেলি। গোল বাধে তাহারই পর। ওইসব নজির নমুনার ভিতর চটজলদি কোনো সম্পর্কসূত্র বাহির করিতে না-পারিয়া আমাদের পুঁটি মাছের প্রাণ, হতাশায় বা/ ও অধৈর্যে সখের-গোয়েন্দাগিরি হইতে ইস্তফা দেয়। কিন্তু এলোমেলো সেই নজিরগুলি গুছাইয়া রাখিতে পারিলে কোনো প্রকৃত সত্যান্বেষীর কাজে আসিতে পারে। এমন একটি বিবেচনায় বর্তমান রচনার সূত্রপাত।

একই অভিব্যক্তি প্রকাশে আমরা যে একই সঙ্গে নানান শব্দ এস্তেমাল করি, তাহা ভাষার তাকতেরই দিক। অবশ্য ইতিহাস-ভূগোলের নানা প্রান্তে এধরনের শব্দের জোয়ার-ভাটাও চলে। কখনও তাহারা এমনভাবে চেহারা বদল করে যে চিনিবার উপায় অবধি থাকে না। যেমন, তেকারণে মোক বোলসি হেন কাজ (শ্রীকৃষ্ণকীর্তন, তাম্বুলখণ্ড)। কে বলিবে এই মোক আজিকার আমাকে-র সমার্থক! কখনও আবার বহু শতক ধরিয়া ব্যবহৃত শব্দও কালক্রমে অচলিত হইয়া পড়ে। যেমন, এবেঁ আকুলী হঞাঁ কাম বাণে কেহ্নে চাহসি আহ্মারে (শ্রীকৃষ্ণকীর্তন, রাধাবিরহ)। আহ্মারে বা তাহার পরিবর্তিত রূপ আমারে, সাম্প্রতিক লিখিত ভাষা হইতে বেমালুম গায়েব।


ভাষার শ্রী ও সুষমাকে কতদূর বাড়াইয়া দিতে পারে, তাহার নজির রহিয়া গিয়াছে শ্রীকৃষ্ণকীর্তন-এর শ্লোকের পর শ্লোকে।


উপরের দুইটি উদাহরণই আমি-কেন্দ্রিক। আমি, অর্থাৎ উত্তম পুরুষ একবচন। যতই আমরা গৌরবার্থে বহুবচনের মহড়া লই, যে-কোনো তর্ক-বাহাসের কেন্দ্রে যিনি বসিয়া থাকেন, তিনি সেই একবচনের আমি। এই আমা-কে লইয়াই যত গোল! আমায়-কে লইয়াও। আমা-কে লইয়াই যে সংসারের নানান ঝামেলা আসিয়া হাজির হয়, তাহা নয় মানা গেল। কিন্তু আমায়-কে লইয়া সমস্যা কিসের! সব সমস্যা তো ঠিক যুদ্ধ, ভূমিকম্প বা অনাহারে মৃত্যুর মতো নহে। অনেক সমস্যার কারণ হয়তো আমি নিজেই বুঝি না। সে বলিতেছে আমটি মিষ্ট, অথচ আমার লাগিতেছে কিঞ্চিত পানসা। তাহার সহিত ঝগড়া বাধাইবার জন্য যে এমন বলিতেছি, তাহাও নহে। তবে? হয়তো ইহা এমন এক সূক্ষ্ম অনুভূতি, যাহা তথ্য-উপাত্ত দিয়া প্রতিষ্ঠার নহে। সমস্যা বলিলে সমস্যা, না-বলিলে নয়। তো আমায়-কে লইয়া সমস্যাটি কী?

সমস্যাটা যে ঠিক কী, তাহা টের পাওয়াটাও বর্তমান রচনার একটি কাজ বটে। তাই সবার আগে, নানা আমলে ব্যবহৃত আমায়-এর প্রতিরূপগুলি কী কী ছিল বা আছে, তাহা একটু দেখিয়া লই। কর্তা হিসাবে আমি একাই বহু কাজ করে বটে। কিন্তু যখন তাহাকে (অর্থাৎ আমি-কে) অবলম্বন করিয়া অপর কোনো কর্তার ক্রিয়া সম্পূর্ণতা পায়, তখন হাজির হয় আমি-র কর্মকারক। সেই কর্মকারকের অভিব্যক্তি প্রকাশে আমি-কে নানান বিভক্তির আশ্রয় লইতে হয়। উহারা হইল -রে, -কে, আর -য়(-এ)। অবশ্য কখনও কখনও চ্যুত, বিচ্ছিন্ন, স্থানান্তর বা কালান্তর অর্থে অপাদান কারকেও এই বিভক্তিগুলি যুক্ত হইতে পারে। যেমন, যে জন আমারে ছাড়ি আনে বিলসয় গো এত কিয়ে সহয়ে পরাণে (বৈষ্ণবপদ, কানুরাম দাস, ১৬শ শতক)।

-রে, -কে, আর -য়(-এ) বিভক্তিগুলি সহযোগে আমি-র চেহারা দাঁড়ায়—আমারে, আমাকে আর আমায়। পুরানা বাংলা মো হইতে নিষ্ক্রান্ত মোরে শব্দটিকেও এই ফর্দে লইতে হয়। তাহা হইলে একুনে শব্দ দাঁড়াইল ৪টি। এই ৪টি শব্দের সাহায্যে আমরা বিভিন্ন বা একই কালে একই অভিব্যক্তি প্রকাশ করিয়াছি বা করি। সময় হইতে সময়ান্তরে শব্দভেদে প্রকাশের সংখ্যাগত গুরুত্বের তারতম্য ঘটিলেও, তাহাদের বুঝকারিতে আজিও কিছু ফারাক ঘটে নাই।

২. চর্যাপদ-এ উত্তম পুরুষের একবচন অর্থে আমহে, ম, মোএ ও মই শব্দের একাধিক ব্যবহার দেখা যায়। কিন্তু তাহার কর্মকারকের কোনো দৃষ্টান্ত নাই। তবে অন্যান্য সর্বনাম ও বিশেষ্যের পর পাওয়া যাইতেছে -রে, -এ, -এঁ, -ক ইত্যাদি বিভক্তির প্রয়োগ।

-রে বিভক্তি ১. কাহেরে ঘিণিমেলি অচ্ছহু কীস। (কাহাকে গ্রহণ ও ত্যাগ করিয়া কী লইয়া আছি) চর্যা ৬ ২. জিম জিম করিণা করিণিরে রিসয় ( যেমন যেমন করী করিণীকে ঈর্ষা করে) চর্যা ৯ ৩. কেহো কেহো তোহোরে বিরুআ বোলই। (কেহ কেহ তোমাকে বিরূপ (কথা) বলে) চর্যা ১৮ ৪. কাহেরে কিস ভণি মই দিবি পিরিচ্ছা (কাহাকে কী বলিয়া আমি উত্তর দিব) চর্যা ২৯ ৫. মারিঅ ভবমত্তারে দহ দিহে দিধলি বলী (ভবমত্তকে মারিয়া দশদিকে বলি দিল) চর্যা ৫০

-এ বিভক্তি ১. তুলা ধুণি ধুণি সুনে আহারিউ (তুলা ধুনিয়া ধুনিয়া শূন্যকে আহরণ করা হইল) চর্যা ২৬ ২. বিসঅ বিসুদ্ধে মই বুজঝিঅ আনন্দে (বিষয় বিশুদ্ধি দিয়া আমি আনন্দকে বুঝিয়াছি) চর্যা ৩০ ৩. শাখি করিব জলন্ধরি পাএ (জলন্ধরি পা-কে সাক্ষী করিব) চর্যা ৩৬ ৪. সদ্গুরু বঅণে ধর পতবাল (সদ্গুরু বচনকে ধরো পত্রপাল [হাল) চর্যা ৩৮ ৫. কালে বোবে সংবোহিঅ জইসা (কালাকে দিয়া বোবাকে সংবোধিত করা যেমন) চর্যা ৪০

-এঁ বিভক্তি ১. দুঃখেঁ সুখেঁ একু করিয়া ভুঞ্জই ইন্দী জানী (দুঃখসুখকে এক করিয়া জ্ঞানী ইন্দ্রিয় ভোগ করে) চর্যা ৩৪

-ক বিভক্তি ১. মতিএঁ ঠাকুরক পরিনিবিত্তা (মন্ত্রী দিয়া ঠাকুর [রাজা-কে পরিনিবৃত্ত করা হইল) চর্যা ১২

কর্মকারকে উত্তম পুরুষ একবচনের কোনো রূপ না-পাইলেও অপর সর্বনাম বা বিশেষ্যের চেহারা হইতে অন্তত এটুকু বুঝা যায় যে, বাংলা ভাষায় -রে, -এ বা -ক বিভক্তিগুলির প্রয়োগ চর্যাপদের আমল হইতেই শুরু হয়। যদিও -ক বিভক্তির ব্যবহার সেই পর্যায়ে যথেষ্ট কম। -রে আর -এ প্রায় সমান লোকপ্রিয়।

একই অভিব্যক্তিকে নানাভাবে প্রকাশ করিতে পারার এলেম যে ভাষার শ্রী ও সুষমাকে কতদূর বাড়াইয়া দিতে পারে, তাহার নজির রহিয়া গিয়াছে শ্রীকৃষ্ণকীর্তন-এর শ্লোকের পর শ্লোকে। হয়তো ব্যাকরণের নিয়ন্ত্রণ শিথিল থাকায় এই বহুত্ব আরও পল্লবিত হইয়াছে। কিন্তু তাহাতে ভাষার সৌন্দর্য বাড়িয়াছে বই কমে নাই। কর্মকারকে উত্তম পুরুষ একবচনেরই এতগুলি বিকল্প পাই আমরা—মোঞেঁ, মোরে, মোক, মোকে, আহ্মারে, আহ্মাক, আহ্মা (শূন্য বিভক্তি)। এই সূত্রে শ্রীরাগের উপর আধারিত রাধাবিরহের একটি পদের খানিক অংশ পড়িয়া লইতে পারি আমরা।

নানা তপফলে তোহ্মা মোরে দিল বিধী। আরে কেহ্নে ঘর জাইতে মোকে বোল গুণনিধী।। ল ।। ... পরাণে না মার মোরে দেব গদাধরে। তিরিবধভয় কেহ্নে নাহিক তোহ্মারে।। ... হেন মনে পরিভাব জগৎ ইশর। আহ্মাক পরাণে মাইলে কি লাভ তোহ্মার।। আনুগতী ভকতী আনাথি আহ্মি নারী। তভোঁ কেহ্নে আহ্মা পরিহরহ মুরারী।। এত কাল আহ্মাক তেজিতেঁ এখোখণে। সকতি না ভৈল তোর নেহার কারণে।। কোণ লাজে বোল এবেঁ মোক জাইতে ঘর। গাইল বড়ু চণ্ডীদাস বাসলীবর।।

একটি পদের ভিতরেই আধুনিক আমারে শব্দের কত রূপান্তর—মোরে, মোকে, আহ্মাক এবং আহ্মা (শূন্য বিভক্তি)! যদিও ভাষাতাত্ত্বিকদের মতে, -কে (বা প্রাচীন -ক) বিভক্তি বাংলার পাশ্চাত্য (বা, গৌড়ী) উপভাষাগুলির লক্ষণ, আর -রে বিভক্তি প্রাচ্য (বা, বঙ্গীয়) উপভাষাগুলির লক্ষণ। তথাপি দেখা যাইতেছে, শ্রীকৃষ্ণকীর্তন-এ আসিয়া চর্যাপদ-এ ব্যবহৃত -রে বিভক্তি ভালোভাবেই বহাল আছে। সময়ান্তরে ও স্থানান্তরে -ক বিভক্তির ব্যবহার প্রচুর বাড়িয়াছে। -ক হইতে -কে বিভক্তিরও সৃষ্টি হইয়াছে। বরং বেশ কমিয়া গিয়াছে -এ বিভক্তির প্রয়োগ। কোন্‌ দিক হইতে কোন্‌ বিভক্তি ফাঁক পাইয়া ঢুকিয়া পড়িল, তাহা লইয়া কোনো সরল সিদ্ধান্ত ঘোষণার আগে, জোয়ার-ভাটার এই লীলাটুকু আমাদের মনে রাখিতে হইবে।

৩. আসলেই ভাষার অধিক লীলাময় এ-সংসারে আর কিছু আছে কি না, তাহা লইয়া ধন্দ জাগে। মাঝে মাঝে মনে হয়, মানুষই কি তাহার ভাষার মালিক? না কি ভাষাই মানুষকে রচনা করে? সামান্য ওই উত্তম পুরুষের একবচনের রূপটি তো বাংলায় দিব্য একটি সরলরেখায় আগাইতে পারিত। তাহা নহে! শ্রীকৃষ্ণকীর্তন-এর পর শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরিয়া -ক বা -কে বিভক্তি যেন ভাষা হইতে উধাও হইয়া গেল। -এ বিভক্তির তো কথাই নাই। অন্তত লিখিত রচনার সাক্ষ্য তাহাই। কবির পর কবির কাব্যের পর কাব্য জুড়িয়া শুধু -রে বিভক্তির একচ্ছত্র আধিপত্য।

১৫শ শতক

১. দোসর ধাতা পিরিতি হইল। সেই বিধি মোরে এতেক কৈল।।                                                   চণ্ডীদাস

২. মোরে লৈয়া যাও যাও রাজা যথায় মা বাপ। মোরে না দেখিলে বাপ পাইবেক তাপ।।                                        কৃত্তিবাস

১৬শ শতক

১. কি খনে দেখলুঁ তাঁরে                   না জানি কি কৈল মোরে                   আট প্রহর প্রাণ ঝুরে।                                                বলরাম দাস

২. যতেক পিরিতি পিয়া করিয়াছি মোরে আখরে আখরে লেখা হিয়ার ভতরে।।                                            বলরাম দাস

৩. হের যে আমারে দেখ মানুষ আকার গো                                     মনের অনলে আমি পুড়ি।                        বাসুদেব ঘোষ

৪. আমারে ঈশ্বর মানে আপনারে হীন। তার প্রেমে বশ আমি না হই অধীন।।                                            কৃষ্ণদাস কবিরাজ

৫. সই, কি করব কহ মোরে।                                                       জ্ঞানদাস

৬. নায়্যার নাহিক ভয়                   হাসিয়া কথাটি কয়                   কুটিল নয়নে চাহে মোরে।                                          জ্ঞানদাস

৭. কোন কুমতিনি মোর                   এ ঘর ভাঙ্গিয়া নিল আমারে ফেলিয়া দিগন্তর।।                                                          নরোত্তম দাস

৮. আমারে মরিতে সখি কেন কর মানা। মোর দুঃখে দুঃখি নও ইহা গেল জানা।।                                         নরোত্তম দাস

৯. যতনে পরাহ মোরে নিজ আভরণ। সঙ্গে লইয়া চল মোরে বঙ্কিমলোচন।। তোমার পীতবাস আমারে দাও পরি। উভ করি বান্ধ চূড়া আউলায়্যা কবরী।।                                          রামানন্দ বসু

১০. নারদের থাকে দোষ                   দূর কর অভিরোষ                   কর মোরে কৃপাবলোকন।।                                        মুকুন্দরাম

১২. তুই পাপমতি বাঁঝি                   হইলি অযশভাজী                   কহ মোরে কেমন উপায়                                            মুকুন্দরাম

-রে বিভক্তির এই বহু ব্যবহার দেখিয়া মনে হয়, অঞ্চল নির্বিশেষে মোরে বা আমারেই ছিল তখনকার প্রমিত বাংলার বিশিষ্ট প্রয়োগ। হয়তো সমগ্র বাংলাদেশের বেশিরভাগ জায়গার জবানে আমারে-ই উচ্চারিত হইত। যেকোনো কারণেই হউক, -কে বা -য়(-এ) বিভক্তি কিছু পিছু হঠিয়াছিল। এই ধারণা আরও দৃঢ় হয় ১৭শ শতকের প্রধান দুই কবির কাব্য হইতে। একজন চট্টলের আলাওল। অপর জন, রাঢ়ের কেতকাদাস ক্ষেমানন্দ। প্রথম জনের পদ্মাবতী এবং দ্বিতীয়ের মনসামঙ্গল, দুই রচনাতেই -রে বিভক্তির ছড়াছড়ি। কিছু নমুনা দেখা যাক্‌।

আলাওল

১. একত পণ্ডিত আমি আর আছে পাখা। আমারে ধরিতে পারে কেমন বরাকা।।

২. তুমি মহা সত্ত্ব                            না বুঝিয়া তত্ত্ব                   কেনে মোরে দেও দোষ।।

৩. আপনা চরিত                            না বুঝিয়া রীত                   আমারে বোল মুগ্ধ।। ৪. যদ্যপি নৃপের পক্ষী প্রিয় সুপণ্ডিত। এমত বলিতে মোরে না হএ উচিত।।

কেতকাদাস

১. কতেক দিবস                            মনের মানস                   সাধ খাওয়াইবে মোরে।।

২. সাধু ধনপতি তথা অদত্তা কন্যার কথা                   কহিল সে সকল আমারে।।

৩. বুড়ি বলে আমারে দেখিয়া ক্ষীণবল। সে কারণে দিলি গায়ে গোড়ালির জল।।

৪. মোরে বিড়ম্বিলা ধাতা। মায়ে ঝিয়ে না হৈল কথা।।

৫. যদি মোরে জিজ্ঞাসিলে ত্রিদিব ঠাকুর। চাঁদ সদাগর হয় আমার শ্বশুর।।

৪. অবশ্য এই বিপুল সময়ের ভিতর, উত্তম পুরুষ একবচনের কর্মকারকে -কে আর শূন্য বিভক্তিরও সামান্য কিছু প্রয়োগ কখনও কখনও দেখা যায়। যেমন–

১. না জানিয়া মূঢ় লোকে                            কী জানি কি বলে মোকে                            না করিয়ে শ্রবণ গোচরে।                                     মুরারি গুপ্ত

২. আমাকে ত যে যে ভক্ত ভজে যেইভাবে। তারে সে সে ভাবে ভজি এ মোর স্বভাবে।।                                       কৃষ্ণদাস কবিরাজ

৩. অনেক আদর করি বহুল সম্মানে। সতত পোষন্ত আমা অন্নবস্ত্র দানে।।                                                 আলাওল

৪. কন্যা সম্বোধিআ কহে ছাড়িয়া নিশ্বাস। এবে আমা আজ্ঞা দেও যাই বন দেশ।।                                            আলাওল

আরও একটা লক্ষ করিবার মতো বিষয় হইল, এই পর্যায় কবিরা যখন ব্রজবুলি আশ্রয় করিয়াছেন, তখন কিন্তু কর্মকারকে -হে বা -য় বিভক্তির প্রয়োগ দেখা যাইতেছে। যেমন—

১. যব হাম শঙ্কর                            তুয়া নিজ কিঙ্কর                   দেওবি মোহে আধ অঙ্গ।।                                            গোবিন্দদাস

২. তুঁহু যদি অভিমানে                            মোহে উপেখসি                            হাম কাঁহা যাওব আর।।                                      জ্ঞানদাস

৩. সখি হে, কি পুছসি অনুভব মোয়।                                               কবিবল্লভ


রবীন্দ্রনাথের রচনার বিপুলতা আমাদের মতো অলস ও নাদান মানুষের পক্ষে এক ভয়াবহ অরণ্যের সামিল।


বহুকাল পরে রবীন্দ্রনাথ যখন ভানুসিংহ ঠাকুরের পদাবলী (প্র. ১৮৮৪) লিখিতেছেন, তখনও এই মোয়-শব্দের ব্যবহার চোখে পড়ে—কো তুঁহু বোলবি মোয় (গান নং ২০)। ব্রজবুলির এই ‘মোহে’ বা ‘মোয়’ অনেকটাই বাংলা ‘আমায়’-এর কাছাকাছি। তবে ব্রজবুলি নয়, একেবারে বাংলা পদেও অন্তত এক জায়গায় সেই -য় বিভক্তির দেখা মিলে—তোমায় আমায় একই পরাণ / ভালো সে জানিয়ে আনি (জ্ঞানদাস)। কিন্তু বুঝাই যাইতেছে এইখানে কর্ম নয় অধিকরণ কারকের প্রয়োগ ঘটিয়াছে। অর্থাৎ, তোমাতে আমাতে একই পরাণ। রবীন্দ্রনাথের বহুশ্রুত একটি গানেও এইরকম প্রয়োগ রহিয়াছে—তোমায় আমায় মিলন হবে বলে।

তথাপি এই সামান্য -কে বা -য় বিভক্তির উদাহরণগুলিকে ভাষার মোদ্দা প্রবণতায় দলছুটই বলিতে হয়। যেহেতু ১৮শ শতকের অবিসংবাদী কবি ভারতচন্দ্র (১৭০৩-১৭৬০)-এর রচনাতেও ‘আমায়’ বা ‘আমাকে’-র বদলে সেই মোরে/ আমারে-র ব্যবহারই নিরঙ্কুশ –

১. কোন্‌ ফুল বঁধু                   পান কর‍্যা মধু হয়্যা আলে যাদু                            পোড়াতে মোরে।।

২. তোমায় কি দোষ দিব          বাপ-মায় কী বলিব হরি হরি শিব শিব          যম মোরে ভুল্যাছে।।

৩. দয়া কর মহামায়া          দেহ মোরে পদচ্ছায়া                   কোটি কোটি করিএ প্রণাম।।

৪. সেই আজ্ঞা শিরে বহি          নূতন মঙ্গল কহি                   পূর্ণ কর চাহিয়া আমারে।।

৫. যজ্ঞ করিয়াছে দক্ষ শুন তার মর্ম্ম। আমারে না দিবে ভাগ এই তার কর্ম্ম।।

৬. তোমার শাশুড়ী বলি যম নাহি লয়। আমারে কাহারে দিবা কহ দয়াময়।।

৭. বিদ্যা বলে ওলো হীরা মোর দিব্য তোরে কোনোমতে দেখাইতে পার নাকি মোরে।।

৮. সাত দিন ক্ষম মোরে          ধরি আমি দিব চোরে                   প্রাণ রাখ গরিবনেবাজ।।

৯. কেটে ফেল চোরে          ছাড়ি দেহ মোরে                   ধর্ম্মের বান্ধহ সেতু।।

১০. তবে যে আমারে দেখা দিল মহামায়া। তার মূলে কেবল তোমার পদচ্ছায়া।।

১৮শ শতকের আর এক বৈষ্ণব কবি, দীনবন্ধু দাসের পদেও দেখিতেছি সেই -রে বিভক্তি—

আপনার বসন ভূষণ দেহ মোরে। ধরিঞা তোমার বেশ আমি রহি ঘরে।।

৫. আমাদের ধারণা, ১৮শতকের মাঝামাঝি হইতেই বাংলার কথ্যভাষায় উত্তম পুরুষের একবচনের কর্মকারকের অভিব্যক্তিতে ‘আমায়’ কিছুটা জায়গা করিয়া লয়। যাহার নজির আমরা পাই রামপ্রসাদ আর লালনের গানে। ইহার জের চলে রবীন্দ্রনাথ অবধি। অবশ্য আরও প্রাচীন মৈমনসিংহ-গীতিকাতেই এই আমায়-এর ব্যবহার শুরু হইয়া গিয়াছিল। অবশ্য তাহারা সংখ্যায় সামান্যই—

১. তুমি যদি ডুব কন্যা আমায় সঙ্গে নেও               —মলুয়া

২. আমায় বিয়া করলে চিত্তে পাইবা বড় সুখ         —কমলা

৩. আলাল দুলালে বিবি আমায় সপ্যা দিয়া           —দেওয়ানা মদিনা

কিন্তু সেইখানেও আমি-র কর্মকারকে আমারে/মোরে-র ব্যবহারই পুরাদস্তুর স্বাভাবিক রীতি। কিছু উদাহরণেই সেই প্রবণতা স্পষ্ট হয়—

১. পাষাণ হইয়া মাও বাপে বধিল আমারে—মহুয়া

২. নিখা যদি কর মোরে ভাল মত চাইয়া—মলুয়া

৩. সেই মতে আমারে যে ভাব্যাছে লম্পটা—মলুয়া

৪. তিলেকের লাগ্যা চায় দেখিতে আমারে—চন্দ্রাবতী

৫. পাপিষ্ঠা জানিয়া মোরে না হইলা সম্মত—চন্দ্রাবতী

৬. প্রাণে বাচাও মোরে কন্যা খাও মোর মাথা—কমলা

৭. লক্ষ্মী বুঝি ছলিবারে আমারে আইলারকমলা

৮. দেওয়ান ভাবনার কাছে মোরে দিবে আজি বিয়া—দেওয়ান ভাবনা

৯. আমারে বান্ধিয়া নিল ভাবনার সহরে—দেওয়ান ভাবনা

১০. তাইতে একটু সময় দেও মোরে ধার—দস্যু কেনারামের পালা

১১. ঝাঁপ না মারিয়া মোরে কইরা দিব দূর—দেওয়ানা মদিনা

১২. রূপবতী বলে—মাও          ধরি তোমার দুই পাও                   আমারে লইয়া চল যাই                                —রূপবতী

অতঃপর দুই সাধক কবি, রামপ্রসাদ আর লালনের গানে আসিয়া আমায়-এর বহুল ব্যবহার পাওয়া যাইতেছে। প্রসঙ্গত তাহারা উভয়েই ভাগীরথীর পূর্বকূলের মানুষ। পহেলা রামপ্রসাদ (১৭২৩-১৭৮১)-এর গান হইতে কিছু নমুনা দেখা যাক—

১. চেন না আমারে শমন, চিনলে পরে হবে সোজা

২. আমায় দাও মা তবিলদারী

৩. মা আমায় ঘুরাবে কত / কলুর চোখ ঢাকা বলদের মতো

৪. ভোলা আপন ভালো চায় যদি সে, চরণ ছেড়ে দিক আমারে

৫. যদি বিমাতা আমায় করেন কোলে দূরে যাবে মনের ব্যথা

৬. জন্ম জন্মান্তরেতে মা কত দুঃখ আমায় দিলি

৭. ভূতলে আনিয়া মাগো করলে আমায় লোহাপিটা

৮. ভূতের বেগার খাটব কত/ তারা বল আমায় খাটাবি কত

৯. আমায় কি ধন দিবি তোর কি ধন আছে

১০. তুমি যে পদে ও পদ পেয়েছ সে মোরে অভয় দিয়াছে

দেখা যাইতেছে, রামপ্রসাদের ১০টি গানের মধ্যে ৭টিতেই আমায়-এর ব্যবহার রহিয়াছে। এইবার ফকির লালন শাহ (১৭৭৫-১৮৯১)-এর গানের কিছু পদ পড়িয়া লওয়া যাক্‌—

১. এবার আমায় যদি না তরাও গো সাঁই/ তোমার দয়াল নামের দোষ রবে সংসারে।।

২. পার কর দয়াল আমায় কেশে ধরে।/ .../ ডুবালো ঘাটায় ঘাটায়/ আজ আমারে।।

৩. সকলিকে নিলে পারে/ আমাকে চাইলে না ফিরে।

৪. ... লয়ে যেত আমায় বিরজা পারে।। / .../ আমারে ডুবালি অবোধ মন

৫. পারে লয়ে যাও আমায়।

৬. অধীন লালন বলে হে দয়াময়/ দয়া কর আজ আমায়।।

৭. খুঁজি তারে আসমান জমি/ আমারে চিনিনে আমি

৮. পড়শী যদি আমায় ছুঁতো/ আমার যম যাতনা যেতো দূরে।।

৯. লালন বলে কেশে ধরে/ তুলে নেও গুরু আমায়।।

১০. কিসে দয়া তার/ হবে পাপীর পর/ কে বলবে আমারে সন্ধান করে।

লালনের উদ্ধৃত পদগুলিতে আমায়-এর ব্যবহার সর্বাধিক। উত্তম পুরুষে কর্মকারকের ১২টি উদাহরণের মধ্যে আমায় ৭টি, আমারে ৪টি আর আমাকে ১টি। এটি লক্ষণীয় যে, আমারে-র বদলে আমায়-এর ব্যবহার যেমন জাঁকাইয়া বসিয়াছে, অন্তত একটি ক্ষেত্রে আমাকে-র ব্যবহারও দেখা যাইতেছে।

১৯শ শতকেও বৈষ্ণব কবিতার একটি ক্ষীণ ধারা ছিল। সেইসব গৌণ পদকর্তাদের রচনাতেও রামপ্রসাদ বা লালনের মতো, আমায়-এর ব্যবহারই চোখে পড়ে—

১. বুঝায়ে মায় নে ভাই আমায়/ তা নইলে বল্‌ যাই কেমনে।। —কৃষ্ণকমল গোস্বামী

২. যদি আমায় চরণ দিবে/ দাস-নাম সার্থক হবে—রাধারমণ চরণদাস

তাহা হইলে কি এই সময় আসিয়া, বাংলা ভাষা না হউক, অন্তত বাংলা কবিতা, আমারে-র অভ্যাস কাটাইয়া আমায়-এর যুগে প্রবেশ করিয়াছে বলা যায়? অতটা সুনিশ্চিত করিয়া কিছু বুঝিবার আগে আমাদের রবীন্দ্রনাথের দরজায় কড়া নাড়িতেই হয়। মনে রাখিতে পারি, রামপ্রসাদ ও লালনের রচনার উদাহরণগুলি সবকটি গান হিসাবেই রচিত। এবং আজ অবধি গান হিসাবেই গীত হয়।

৬. রবীন্দ্রনাথের রচনার বিপুলতা আমাদের মতো অলস ও নাদান মানুষের পক্ষে এক ভয়াবহ অরণ্যের সামিল। তাহা পুরা ছানবিল করিয়া কোনো তথ্য আহরণ যে-শ্রম ও নিষ্ঠার মুখাপেক্ষী, কবুল করা ভালো সে-এলেম আমাদের নাই। তাই আমরা এক ঝাঁকি দর্শনের উপায় ঠাওরাইলাম। ঠাকুরের যেসব কবিতার প্রথম ২ পঙ্‌ক্তির ভিতর উত্তম পুরুষ একবচন কর্মকারকের ব্যবহার আছে, সে তাহা যে কিসিমেরই হউক, সেগুলিকেই যাচাই করিয়া একটি সারণি বানাইবার কোশেশ করিলাম। এইরূপ কবিতা পাইলাম ৮৫টি। দেখিতেছি তিনি আমারে, মোরে, আমায় এবং আমাকে, এই ৪ রকম শব্দই ব্যবহার করিয়াছেন। তবে আমাকে-র ব্যবহার সর্বাপেক্ষা কম, মাত্র ৩টিতে। আমায়-এর প্রয়োগ সর্বাধিক, ৩৯টিতে। আমারে ও মোরে রহিয়াছে যথাক্রমে ২০ ও ২৩টি কবিতায়। ঠাকুরের অনেক কবিতাই গানও হইয়াছে। এই ৮৫টি কবিতার ভিতর ২১টিই গান হইয়াছে। আমায়-যুক্ত কবিতার গানে রূপান্তর সবার বেশি, ১২টি। রচনাক্রম অনুযায়ী আমরা তাহার এই কবিতাগুলিকে ৩টি পর্যায়ে ভাগ করিলাম। ১. প্রাক্‌-গীতাখ্য—গীতাঞ্জলি পর্যায়ের আগের কবিতা (১৮৮৪-১৯০৬), ২. গীতাখ্য—গীতাঞ্জলি পর্যায় (১৯০৬-১৯১৪) এবং ৩. পরবর্তী (১৯১৪-১৯৩৬)। গীতাঞ্জলি পর্যায়ই আমায়-যুক্ত কবিতার সংখ্যা বেশি, ২৩টি, যাহার ভিতর ১১টিই গানে পর্যবসিত। যাহা হউক, সারণিটি দেখিয়া লওয়া যাক্‌ –

           প্রাক্‌-গীতাখ্য          গীতাখ্য          পরবর্তী          মোট আমারে          ৯ (২)          ৭ (৫)          ৪ (০)          ২০ (৭) মোরে          ১৩ (১)          ২ (১)          ৮ (০)          ২৩ (২) আমায়          ১২ (১)          ২৩ (১১)     ৪ (০)          ৩৯ (১২) আমাকে          -                    -             ৩ (০)            ৩ (০) মোট          ৩৪ (৪)          ৩২ (১৭)       ১৯ (০)          ৮৫ (২১)

[প্রতি সংখ্যার ডান দিকে প্রথম বন্ধনীর ভিতর প্রাসঙ্গিক পর্যায়ের গানে-রূপান্তরিত কবিতার সংখ্যা

আরও এক কৌতূহল-জাগানিয়া তথ্য এই যে, উপরের ৮৫টি কবিতার ভিতর আমাকে-যুক্ত ৩টি কবিতাই ঠাকুরের জীবনের শেষ পর্বে, গত শতকের ৩০-এর দশকে রচিত। অর্থাৎ যখন বাংলা ‘আধুনিক কবিতা’র দামামা বাজিয়া উঠিয়াছে। সেইগুলি হইল—

১. আমি অন্তঃপুরের মেয়ে, চিনবে না আমাকে                                 —সাধারণ মেয়ে, পুনশ্চ, ২৯ শ্রাবণ ১৩৩৯

২. আমাকে এনে দিল এই বুনো চারাগাছটি                                         —নং আট, পত্রপুট, ৫ নবেম্বর ১৯৩৫

৩. আমাকে শুনতে দাও শ্যামলী                                         —প্রাণের রস, শ্যামলী ,‌ ১ জুন ১৯৩৬

আমায়-এর সাথে গানের একটা সম্পর্ক যখন দেখাই যাইতেছে, তখন ঠাকুরের গানের মহলে উঁকি না-মারিয়া উপায় নাই। হালে সকল রবীন্দ্র সংগীত যেহেতু জালচক্রে নথিবদ্ধ, কাজেই তাহার হিসাব পাওয়াটা তুলনায় সহজসাধ্য। কবিতার মতো গানেও উত্তম পুরুষ একবচন কর্মকারকে (কোথাও কোথাও অন্য কারকেও) আমারে, মোরে, আমায় এবং আমাকে, এই ৪ রকম শব্দেরই ব্যবহার রহিয়াছে। নাটক ও নৃত্যনাট্যের গান ধরিয়া মোট ৩৬০টি গানে এই শব্দগুলির প্রয়োগ দেখা যায়। একই গানে আমাকে-র একাধিক রূপের ব্যবহারেরও নজির আছে (৫২টি গানে)। মুক্তধারা নাটকের ‘আমাকে যে বাঁধবে ধরে...’ গানটিতে দেখি আমারে, আমায় এবং আমাকে-র যৌথব্যবহার। একইভাবে, নিচের ৩টি গানে আমারে, মোরে এবং আমায়, একই সাথে সকলেই উপস্থিত। গানগুলি হইল—

১. কে জানিত তুমি ডাকিবে আমারে (কীর্তন) (১৯০০ )

২. আজ জ্যোৎস্নারাতে সবাই গেছে (১৯১৪ )

৩. আমারে বাঁধবি তোরা সেই বাঁধন কি (১৯১৬ )

সব মিলাইয়া কিন্তু রামপ্রসাদ-লালনের গানের ধারাতেই, আমায়-এর ব্যবহার রবীন্দ্রগানে সর্বাধিক, ১৮২টি গানে। আর, আমাকে-র উচ্চারণ সব চাইতে কম, মাত্র ৬টি গানে। পুরানা কাব্যরীতির আমারে ও মোরে রহিয়া গিয়াছে যথাক্রমে ১০০ ও ১২৪টি গানে। এই সংখ্যাগুলির ভিতর অবশ্য যৌথ ব্যবহারের উপলক্ষগুলি (৫২) জুড়িয়া আছে।

৭. তাহা হইলে কি রামপ্রসাদ-লালনের সূচিত আমায়-বিপ্লব রবীন্দ্র-ব্যবস্থাপনায় বাংলা কবিতায় অন্তিম বিজয় হাসিল করিল? পাটিগণিত কিন্তু তাহা বলিতেছে না। প্রাচীনতর মোরে এবং আমারে-র প্রয়োগের ধারাটিই বরং তাহার কবিতায় এবং গানে প্রবলতর রহিয়া গেল। আমাদের বাছাই-করা ৮৫টি কবিতার ভিতর মোরে এবং আমারে-র মিলিত প্রয়োগ ৪৩টি কবিতায়, যেখানে আমায়-এর প্রয়োগ ৩৯টিতে। গানের বেলায় অঙ্কটি যথাক্রমে ২২৪ আর ১৮২।


রামপ্রসাদ-লালনের হাত ধরিয়া পত্তনি পাইয়া, রবীন্দ্রনাথের গানে-কবিতায় ব্যবহারের চূড়ান্তে পৌঁছাইয়া, ২শতকের ভিতর শব্দটি এইভাবে গায়েব হইয়া গেল! 


অতঃপর বরিশালবাসী সেই তরুণটির দিকেও তাকাইতে হয়, বাংলা কবিতার দিগন্তকে যিনি রবিশষ্যের বিপুল প্রান্তর পার করাইয়া, নিজে কালক্রমে কলিকাতা নগরীর ট্রাম লাইনে হেঁচড়াইয়া মরিলেন। তাহার কবিতাও কিন্তু একই রকম সাক্ষ্য দেয়। অর্থাৎ সেইখানেও প্রাচীনতর -রে বিভক্তিরই প্রাচুর্য। বিশেষ করিয়া তাহার প্রথম জীবনের কবিতায় তো আমারে বা মোরে ছাড়া উত্তম পুরুষের একবচনে কর্মকারকের আর কোনো বিকল্প শব্দই নাই। ধূসর পাণ্ডুলিপি-তে ২৬বার আমারে এবং ১বার মোরে শব্দ ব্যবহৃত। আমাকে বা আমায়, বিলকুল নাই। পরবর্তীতে দেখা যাইতেছে, যখন তিনি চলিত ভাষায় লিখিতেছেন, তখন আমাকে ব্যবহার করিতেছেন, আর সাধুভাষার রচনায় সেই সাবেকতর আমারে। তাই বনলতা সেন কবিতাবহির হাওয়ার রাত, নগ্ন নির্জন হাত, অন্ধকার, দুজন, আমাকে তুমি, অঘ্রাণ প্রান্তরে এবং মহাপৃথিবী-র শ্রাবণরাত, আদিম দেবতারা, আজকের এক মুহূর্ত, ফুটপাথে ইত্যাদি কবিতায় পাওয়া যায় আমাকে-র ব্যবহার। আবার সাধুভাষায় লিখা বনলতা সেন, শঙ্খমালা, ফিরে এসো, সিন্ধুসারস আদি লেখন ইত্যাদি কবিতায় আমারে-ই বহাল। বলা বাহুল্য, রূপসী বাংলা-নামের কবিতাবলীতে শুধুই আমারে-রই উপস্থিতি। আবার বেলা অবেলা কালবেলা-য় তেমনই শুধুই আমাকে। না, শুধুই আমাকে নহে। জীবনানন্দের কবিতায় যে-একটি মাত্র আমায়-এর ব্যবহার চোখে পড়ে, সেটি অবশ্য ওই কবিতাবহিতেই আছে—

আজকে এ-রাত তোমার থেকে আমায় দূরে দাঁড় করিয়ে দিয়ে তবুও তোমার চোখে আত্মা আত্মীয় এক রাত্রি হয়ে রবে।                                         —গভীর এরিয়েলে, বেলা অবেলা কালবেলা

এইরূপ বলা যাইতে পারে যে, বরিশালি পটভূমির জন্য জীবনানন্দ হয়তো বহুদিন পর্যন্ত -রে বিভক্তি ব্যবহার করিয়া গিয়াছেন। কিন্তু নগরায়িত হইবার পর -রে -কে ক্রমেই জায়গা ছাড়িয়া দিতেছে -কে বিভক্তি। নগর তাহাকে -য়-লিপ্ত করিল, এমন সাক্ষ্য তাহার কবিতা দেয় না। খাশ কলকাতিয়া বিষ্ণু দে-র কবিতাতেও আমায়-কে দেখা যায় মাত্র কয়েক বার, তাও কেবল কিছু জনজাতির লোককবিতার অনুসৃজনে। আমারে বা মোরে যে তাঁহার কবিতায় বিশেষ পাওয়া যাইবে না, তাহাতে বিস্ময়ের কিছু নাই। তাহা হইলে রহিল পড়িয়া শুধুই—আমাকে। তাহার ১৬৩টি শিরোনামভুক্ত বিভিন্ন কবিতার একটি সংকলনে মোরে, আমারে, আমায় ও আমাকে শব্দের উপস্থিতির হার এইরকম—

মোরে – চোরাবালি (১৯২৬-৩৭) # মহাশ্বেতা (১টি)

আমারে – পূর্বলেখ (১৯৩৭-৪১) # জন্মাষ্টমী (২টি)

আমায় – সন্দীপের চর (১৯৪৪-৪৭) # সাঁওতাল কবিতা (৩টি), ছত্তিশগড়ী গান (১টি), উরাওঁ গান (১টি)

আমাকে – উর্বশী ও আর্টেমিস (১৯২৯-৩৬) # পলায়ন (১টি), সন্ধ্যা (১টি)

চোরাবালি (১৯২৬-৩৭) # গার্হস্থাশ্রম (২টি), মহাশ্বেতা (২টি)

সন্দীপের চর (১৯৪৪-৪৭) # সাঁওতাল কবিতা (৩টি), ছত্তিশগড়ী গান (২টি)

নাম রেখাছি কোমল গান্ধার (১৯৪৬-৫৩) # পাঁচ প্রহর (১টি)

আলেখ্য (১৯৫২-৫৮) # সে বলে (১টি), সনেট (১টি)

তুমি শুধু পঁচিশে বৈশাখ (১৯৫৫-৬০) # গান (১টি)

স্মৃতি সত্তা ভবিষ্যৎ (১৯৫৫-৬১) # প্রাকৃত কবিতা (২টি), সর্বদাই সুখদা বরদা (১টি)

সেই অন্ধকার চাই (১৯৫৮-৬৫) # ভৈরবীর পত্রাবলীর পাঠোদ্ধার (হপকিন্স অবলম্বনে) (১টি)

৮. ইহার পর আর আমায়-শব্দটি কই? মুখের কথায় ইতস্তত রহিয়া গেলেও, বিগত শতাব্দীর ৫০দশকের পর তো বাংলা কবিতায় শব্দটিকে আতশ কাচ দিয়া খুঁজিতে হয়। রামপ্রসাদ-লালনের হাত ধরিয়া পত্তনি পাইয়া, রবীন্দ্রনাথের গানে-কবিতায় ব্যবহারের চূড়ান্তে পৌঁছাইয়া, ২শতকের ভিতর শব্দটি এইভাবে গায়েব হইয়া গেল! ইহা কি কবিতার উপর গদ্যের প্রভাব? কারণ গদ্যকারদের রচনায়, রবীন্দ্রনাথ সমেত, আমায়-এর উপস্থিতি ক্রমক্ষীয়মাণ। বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ এবং শরৎচন্দ্রের রচনাবলী মন্থনে তাহাদের শব্দ-ব্যবহারের এইরকম একটি হিসাব পাইতেছি—

                        বঙ্কিমচন্দ্র         রবীন্দ্রনাথ         শরৎচন্দ্র আমারে                 ১৯                 ৪৯৬                 ৩ আমায়                 ২৩০                ৬৬৫              ৪৩ আমাকে               ৬০১              ২৮৩২           ১৮৬২

তথ্যপুঞ্জ থেকে কোনো কূলকিনারা মেলে না সত্যের—কোথায় যেন শুনিয়াছিলাম এমন একটি লাইন। তাহা হইলে আমায়-কে লইয়া সমস্যাটা ঠিক কী, কিছুমাত্র কি টের পাওয়া যাইল? যাউক বা না-যাউক্‌, শব্দটির পিছু ধাইয়া কিছু রাত তো জাগিয়া কাটানো যাইল। তাহাই বা মন্দ কী! ¤


পাঠসূচি :
১. চর্যাগীতিকা, সম্পা. সৈয়দ আলী আহসান, বাংলা একাডেমি, ঢাকা, ফেব্রুয়ারি ১৯৮৪
২. বড়ুচণ্ডীদাসের শ্রীকৃষ্ণকীর্তন, অমিত্রসূদন ভট্টাচার্য, কলকাতা, মে ১৯৮৩
৩. পাঁচশত বৎসরের পদাবলী, বিমানবিহারী মজুমদার, কলকাতা, কার্তিক ১৩৮৭
৪. কৃত্তিবাসের রামায়ণ [উত্তরাকাণ্ড, সম্পা. জাহ্নবীকুমার চক্রবর্তী, কলকাতা, মাঘ ১৩৮৫
৫. কবিকঙ্কণ চণ্ডী, মুকুন্দরাম চক্রবর্তী, বসুমতী সংস্করণ, কলকাতা, বৈশাখ ১৩৭০
৬. মনসামঙ্গল, কেতকাদাস ক্ষেমানন্দ, সংকলন ও সম্পা. বিজনবিহারী ভট্টাচার্য, সাহিত্য অকাদেমি, নয়াদিল্লি, ১৯৭৭
৭. আলাওলের পদ্মাবতী, সম্পা. আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, ১৯৮২
৮. মৈমনসিংহ-গীতিকা, দীনেশচন্দ্র সেন সঙ্কলিত, কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, ১৯৭৩
৯ ভারতচন্দ্র, সংকলন ও সম্পা. মদনমোহন গোস্বামী, সাহিত্য অকাদেমি, কলকাতা ২০০৬
১০. রবীন্দ্ররচনাবলী, কবিতা (৩) ও গান (১) খণ্ড
১১. জীবনানন্দ দাশের কাব্যগ্রন্থ, কলকাতা, (১ম খণ্ড) মাঘ ১৩৮২, (২য় খণ্ড) শ্রাবণ ১৩৮১
১২. শ্রেষ্ঠ কবিতা, বিষ্ণু দে, কলকাতা ১৯৮১
১৩. ভাষা-প্রকাশ বাঙ্গালা ব্যাকরণ, সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, কলকাতা, পৌষ ১৩৯৪
১৪. ভাষার ইতিবৃত্ত, সুকুমার সেন, বর্ধমান সাহিত্যসভা, ১৯৫৭
১৫. বাঙলা ভাষা পরিক্রমা, পরেশচন্দ্র মজুমদার, কলকাতা, মাঘ ১৩৮৩
১৬. http://www.gitabitan.net/index.asp
১৭. http://www.rabindra-rachanabali.nltr.org/
১৮. http://www.bankim.rachanabali.nltr.org/
১৯. http://www.sarat-rachanabali.nltr.org/
গৌতম চৌধুরী

গৌতম চৌধুরী

জন্ম ১৮ ফাল্গুন ১৩৫৮, ২ মার্চ ১৯৫২, কানপুর, উত্তর প্রদেশ, ভারত। শিক্ষা : উচ্চ...বিস্তারিত