কাজী নাসির মামুনের দীর্ঘ কবিতা ‘রোহিঙ্গাপুস্তকে আত্মহত্যা লেখা নেই’ প’ড়ে মনে হয়েছে, কবির সংগ্রাম যে বিষয় ও আঙ্গিকে সমকালীন হয়ে ওঠা—তা আবার মান্য হলো। কোনো মানবিক দায় যদি কবিতার উৎসপ্রেরণা হয়, তাহলে সেটি হয়ে ওঠে অনুভূতির ইতিহাস। এবং তাতে কবির অবস্থানও প্রামাণ্য হয়ে আসে। আমি মনে করি, মহৎ শিল্পকলা শেষ পর্যন্ত অনুভূতির স্মৃতিশাস্ত্র। এই দীর্ঘ কবিতাটিও তাই। বিস্ময়কর, এ-ধরনের রচনায় বিবৃতির উদ্গীরণ ও স্থূলতার যে ঝুঁকি থাকে, কবি তা এড়াতে পেরেছেন। শিল্পকলার কোনো শর্তকে বিরক্ত না-ক’রে সমকালীন ভূ-রাজনৈতিক ও মানবিক সংকট যে কবিতার উপজীব্য হতে পারে, এই পাণ্ডুলিপি সেই সাক্ষ্য দিচ্ছে।
—চঞ্চল আশরাফ
পৃথিবী মৃত্যুর দিকে গেছে রক্তের নিশানমালা এখন উড়ছে আরাকানে সূর্য কি মুখর আলো? উদয়াস্ত রঙে মাখা প্রখর আগুনে মজা পায়? মরণ-স্তূপের পাশে কুয়াশাঘুঙুর বাদ্য-বিউগল নিয়ে হাঁটে। পতনস্পর্ধায় নামে মানুষের ঢল। আগুন! আগুন! বলে বৃষ্টির ঘূর্ণন মাথায় নিয়েছে ওরা; কান্নার বিকল্প নদী চোখের ভিতর। ভূগোল বঞ্চনা পায়ে পায়ে। জল তুমি রৌদ্রকন্যা? বিকশিত আগুনের বোন? তবে নাফ, কল কল বয়ে যাও ভোরের ব্যথায়; জলধোয়া মানুষের আগুন পোহাই। ভয় আর বাউল-পিপাসা নিয়ে ওরা বোনে সারিবদ্ধ কোলাহল; অবোধ শিশুর লুটোপুটি। বুড়োর শরীরে পথের কর্দম; যেন গৌণ বেঁচে থাকা জীবনের অম্লান উৎসব; জ্যান্ত সুরারোপ পথে পথে। লাখ লাখ বিকল যৌবনে নারীদের কুসুম সান্ত্বনা গান গায়; গহিনে রঞ্জিত বুকের পৃষ্ঠায় টিয়ার ঠোঁটের মতো লাল কিয়ামত : কাটা হাত; কর্তিত মাথার নিচে টুকরো পায়ের নীল ভ্যাবাচেকা; আকাশ জাগছে এরই মাঝে। কারো কারো ভাগ্যচিল উন্মূল পরাস্ত রক্তে ছুঁ মারে; সমূহ খাদ্য জমে শারদ বসন্ত পেয়ালায় বৌদ্ধ ভুখাদের; নারীরা জ্বালানি কাঠ; শিশুরা ইন্ধন। মানুষ পুড়ছে! তবু এই ব্রহ্মদেশে গৃধুল শকুন বিপ্রতীপ দিনের আলোয় ছিন্নভিন্ন লাশের ওপর নাচছে; কুণ্ঠিত পরিচয়ে হাতের নাগালে মানবতা দুমড়ে মুচড়ে গেল; বিস্মিত গৌতম! রক্ত ও নির্বাণ খুব কাছাকাছি? জীবন ধূম্রল প্রজাপতি উড়ে যায় মাংসল বিদ্বেষে। পৃথিবীটা গোল ব্যভিচার অঝোর বৃষ্টির মতো গুলির শৃঙ্গারে বেঁচে আছে সহস্র বন্দুক, রাইফেল এল এম জি, পিস্তল; নারী তার জিঘাংসা-টার্গেট। একদিন মংডুর সকালবেলা কাত-হওয়া রাত্রির আরাম ভেঙে এই সত্যে জেগে ওঠে তৈয়বা বেগম, গুল বাহার, ওনূরা, ফাতুলিরা কেবল দেহের মধ্যে যাদের দরিয়া ছিল ভূতল দোলানো ঢেউ—সমুদ্র পসার তারা কেউ মরে গেছে, কাঠের ডিঙিতে ছায়া ফেলে ভেসে গেছে পতিত যৌবন। ‘সম্পন্ন কৃষক মাঝি মৎস্যজীবী বা ক্ষুদে দোকানদার আছড়ে পড়েছে অন্য দেশের রাস্তায়।’ আমাদের প্রেম তত্ত্ব নীতির অকার্যকর বিশুষ্ক ফানুস তিল তিল গড়ে-ওঠা মায়াসরঞ্জাম আহ্ ওহ্ জীবন্ত প্রস্বরে ভরে তোলে বেদম আকাশ। এক নদী মুত্যুকে আগলে রেখে বুকের ওপর অভুক্ত পূর্ণিমা জ্বালে উদ্বাস্তু শিবির। প্রতিটি সংগ্রাম তাই বিষাক্ত অঙ্কুশ; বুনো বেত্রাঘাত উড়ো বেদনার। .......................................................... পেরাংপুরুর এক দুর্লভ শিক্ষক নীতি ও স্বপ্নস্থ লীলা থেকে দূরে এসে জেনেছে নিষিদ্ধ শ্লোক রোহিঙ্গাপুস্তকে আত্মহত্যা লেখা নেই। আছে জন্ম সুগভীর, বিশ্বস্ত সংসার গৃহের সংহতি আর পীড়ন সহ্যের ফুটনোট। কোথায় আশ্রয়? কোন নীলিম বিশ্বাসে নিজের স্বদেশ থেকে বিতাড়ন সহ্য হবে তার? প্রসন্ন হত্যার দিনে মোরগ ঝুঁটির মতো লাল অভিঘাত তাকেও পোড়ায়; জীবন-লঙ্ঘিত জ্ঞান মিশেছে রক্তের ডামাডোলে : গলা-কাটা নীরস্ত্র শহিদ শত শত শ্রীমন্ত তন্দ্রায় খুব সামনে উদোম; এইসব ভুলণ্ঠিত মাটির পুতুল কাড়ি কাড়ি বিধ্বস্ত অতীত, স্বপ্ন আর অনাথ কবর ফেলে গেলে কোথায় যিশুর ত্যাগ? জলাঞ্জলি ফুল ও অনন্ত রক্ত-বীণায় বাজবে? সে-ও কি দৌড়ায়? সেই দুর্লভ প্রজ্ঞার নিপীড়িত রক্তের পোষক? অনঙ্গ বিলাপ, রুক্ষ রঙ্গন অথবা আত্মস্থ মৃত্যুর অভিশাপে ত্রস্ত অধিকার ভুলে যেতে হয়; তখন জীবন মানে পায়ের হিশাব। কয়লা চেতন আগুনের দিন নিঃশেষ হবে না আর? প্রসঙ্গ বিলীন হবে নিষ্ফল সংলাপে? .......................................................... গাছ মরে যায় করাত-নিষ্ঠুর এক গল্প ভিতরে আড়াল; সেই নির্মিত মৃত্যুই পরার্থ এখন; দুগ্ধ সঙ্কেত বঞ্চিত শিশুদের। শিকারি চতুর বলে তিরের শক্তিতে মাথানত; ঘুঘুর উড়াল তাই স্বাধীনতা নয়— পাতার মড়ক হলুদের ক্লান্ত জীবদ্দশা। সকল উদয় থেকে দূরে একটি ছাগল তবু সবকিছু খায়; এই ব্যাধি-মর্মর প্রস্তরাঘাত কতকাল বইছে মানুষ। ভাবছে পণ্যই ত্রাতা। বিধৃত ঈশ্বর। ইচ্ছার নির্মোকে বন্দি এইসব শতরঞ্চি-পাতা উপহার ফল্গু ও লোভের লঙ্কা ধনাঢ্য সঙ্কটে পৃথিবীকে দেয় নি কিছুই। শুধু ঝাল-ধরা হা হু। লালায় ভিজানো মাটি শস্যের বিপক্ষে মানুষের ছাই থেকে নিয়েছে কুহক; কয়লায় কুক্ষিগত সোনার বন্দনা সুদ আর শ্রমের বল্কল। শান্তির নিপুণ কাতরানি পুঁজিবিশ্বে নতুন কৌতুক!