বিল বিসেট : প্রথাবিরোধী এক কানাডীয় লেখকের কথা

কানাডীয় সাহিত্যে প্রৌঢ় লেখকদের মধ্যে যার নাম বিভিন্ন কারণেই উচ্চারিত হয় তিনি হলেন বিল বিসেট [জন্ম : ১৯৩৯। বিশাল দেশ কানাডার সর্বপূর্ব অঞ্চল হ্যালিফ্যাক্সে জন্মগ্রহণকারী এই লেখকের নাম বহুল উচ্চারণের কারণ এটি নয় যে, তিনি অন্যতম এক প্রবীণ। প্রকৃত কারণ হলো, সাহিত্য রচনার বাহন যে ভাষা এবং সাহিত্য প্রকাশের উপায় যে প্রকরণ বিল সেগুলোকে ভেঙেচুরে একাকার করে ফেলেছেন। প্রচলিত ভাষা ও প্রকরণের বিরোধিতা তিনি শুরু করেন পাঁচ দশক আগেই এবং যথেষ্ট বিরোধিতার সম্মুখীনও হন। কিন্তু মজার বিষয় হলো পঞ্চাশ বছর ধরেই বিল সে কাজটি করেই চলেছেন এমন দৃঢ়তার সাথে যে সেটাই বিলের বর্তমান পরিচয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।


ভাষা, রচনাশৈলী এবং কাহিনিনির্মাণ সবকিছুতেই প্রচলকে ভেঙে নিজের মতো করে সাজিয়ে নিয়ে কানাডায় যে লেখক প্রতিষ্ঠিত তিনি হলেন বিল বিসেট।


বিস্তারে আলাপের আগে বিলের কয়েকটি বই নিয়ে একটু আলোকপাত করে নেওয়া যাক। বিলকে নিয়ে আলোচনার জন্য এই গ্রন্থ নির্বাচন কোনো সূক্ষ্ম হিসাবের ফল নয়। সেটি করাও কঠিন একটি কাজ যেহেতু বিলের রচনার পরিমাণ বিপুল। আর তাই হাতের কাছে পাওয়া বিল বিসেট রচিত কয়েকটি গ্রন্থকে আশ্রয় করে আমরা আলোকপাতের চেষ্টা করব। এগুলোর মধ্যে দুটি কবিতার—ইনকারেক্ট থটস [১৯৯২ এবং টাইম [২০১০। দুটি উপন্যাসের—নভেল [২০১১ এবং হাংরি থ্রোট [২০১৩। যারা বিলের রচনার সাথে পূর্ব থেকে পরিচিত নন তারা হঠাৎ তার বই দেখলে চমকে যাবেন বৈকি। আমাদের সুবিধার জন্যে যদি আলোচনার চারটি গ্রন্থের শিরোনাম যেভাবে বইয়ে লেখা আছে সেভাবে লিখি তাহলে সেগুলো দাঁড়ায়—

inkorrect thots time novel hungree throat

বিলের সব গ্রন্থনামে বড় হাতের বর্ণ বিবর্জিত, প্রচলিত বানানকে অস্বীকৃত। চমকে যেতে হয় একটি উপন্যাসের নামই যখন হয়ে যায় novel। সারা বই জুড়ে বড় হাতের বর্ণ ব্যবহারকে সম্পূর্ণত এড়িয়ে গেছেন বিল, যেমন তিনি তার নিজের নামের ক্ষেত্রেও করেন। নভেল, টাইম, আনকারেক্ট থটস, থ্রোট-এর সারা বই জুড়ে পাঠক কিন্তু খুঁজে পাবেন না একটিও যতিচিহ্ন। শুধু কী বর্ণ এবং ভাষা ব্যবহারেই বিল নিজেকে সীমাবদ্ধ রেখেছেন? তা কিন্তু নয়। আজকের লেখায় যে দুটি উপন্যাসের নাম বারবার ব্যবহার করছি, লেখক সেগুলোকে বলছেন উপন্যাস। বই খুললে মনে হয় কেমন যেন কাব্য কাব্য ধাঁচের রচনা। শুধু কী তাই? সে ধাঁচে প্লট, চরিত্র, কাহিনি খুঁজে পাওয়াও সহজ কাজ নয় বলেই মনে হয়। এই যে ভাষা, রচনাশৈলী এবং কাহিনিনির্মাণ সবকিছুতেই প্রচলকে ভেঙে নিজের মতো করে সাজিয়ে নিয়ে কানাডায় যে লেখক প্রতিষ্ঠিত তিনি হলেন বিল বিসেট।

প্রথাবিরোধী কানাডীয় কবি বিল বিসেট। ছবিটি ২০০৫ সালে তোলা।

বিলের জন্ম ১৯৩৯ সালে। অর্থাৎ আশির কোঠায় ছুঁই ছুঁই তিনি। গ্রন্থের সংখ্যাও ষাট অতিক্রম করেছে অনেক আগেই। বিলের বইয়ের সংখ্যাটি যখন ত্রিশের কোঠা পার করছিল সেই সময়, ১৯৭৭ সালে, বিলকে নিয়ে কানাডার পার্লামেন্টে একটি আলোচনা উত্থাপিত হয়। পার্লামেন্টের কনজারভেটিভ দলের কয়েকজন সদস্য আপত্তি করেন যে, বিলকে যেন কানাডিয়ান ‘কাউন্সিল ফর দ্য আর্টস’-এর অর্থ সাহায্য না দেওয়া হয়। তারা যে বিলের সাহিত্যকে ‘ডিজগাস্টিং’ই বললেন তাই নয়, সাথে যুক্ত হয়েছিল ‘পর্নোগ্রাফিক’ শব্দটিও। ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়, সে সময় বছর খানেকের জন্য বিল কানাডা কাউন্সিলের কোনো অর্থ সাহায্য পান নি; যদিও সংশ্লিষ্টরা দাবি করেন যে, ওই না পাওয়ার পেছনে সংসদের আলোচনাটি নয়, বরং অন্য কারণ দায়ী ছিল। যদিও ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে বিল বিসেটকে সে সময় অনেক অর্থকষ্টে কাটাতে হয়েছে এবং এক পর্যায়ে তার প্রেসটিও বিক্রি করে দিতে হয়।

বিচারপতি বাবার পুত্র বিল চলমান মধ্যবিত্ত সমাজকে এড়াতে বাড়ি ছেড়ে পালিয়েছেন শৈশবেই। বার কয়েক। এই যে প্রথাসিদ্ধতাকে অস্বীকার করা সেটা যেন বিল সারা জীবন ধরেই করে গেছেন। আর তাই তার সমালোচকেরা তাকে চিহ্নিত করেন এমনভাবে : ‘bill bissett is known for his distinct spelling, for combining lyric, visual and sound poetry with drawing and collage, and for a deceptively rare voice that marks the personal and political perceptiveness of his work.’ বিলের বই হাতে নিয়েই পাঠক যেন এই ভাবনার সম্মুখীন হন।


বিল বিসেটের পাঠক মাত্রই খেয়াল করেছেন ভেঙে ফেলাটাই বিলের ধরন। 


বর্তমান রচনার শুরুতেই যে বলেছিলাম বিলের লেখায় যতিচিহ্নের অনুপস্থিতি বা শুরুতে বড় হাতের হরফ না থাকা—সে সবের সাথে পাঠক অাবিষ্কার করেন ওর গ্রন্থে ছবিরও ব্যবহার। বই নিয়ে খানিকক্ষণ নাড়াচাড়া করলে দেখা যায় বিলের বই জুড়ে লেখার ফন্টগুলো ঠিক যেন এক নয়। কোথাও ছোট, কোথাও আবার বড়। কোথাও যেন বেমানান রকমের বড়।

বিল বিসেটের একটি কাব্যগ্রন্থের প্রচ্ছদ। প্রচ্ছদের শিল্পী কবি নিজেই।

‘lebanon voices’ বা ‘sunday work’ যেগুলো তার শুরুর দিকের রচনা, সেগুলো থেকেই কিন্তু বিলের এই ভিন্নতা। বিল বানানকে ভাঙেন উচ্চারণের মাপকাঠিতে। ‘Hungry’ হয়ে যায় ‘hungree’, যেমনটি আমরা দেখি ‘people’ কে তিনি লেখেন ‘peopul’, ‘devotions’ কে তিনি লেখেন ‘devosyns’। তার এই নিরীক্ষাটি এতই ব্যাপক যে সাম্প্রতিক সময়ে অনলাইন চ্যাটিং-এ ব্যবহৃত শব্দগুলোও তার রচনাতে আমরা আগেই আবিষ্কার করি। ‘forget’ লিখতে ‘4get’, ‘to’ লিখতে ‘2’, ‘you’ লিখতে ‘u’ যেন নৈমিত্তিক হয়ে পড়ে। বিলের ক্ষেত্রে সে প্রয়াসটি এত ব্যাপক যে পুরো রচনাটিই দৃষ্টিতে ভিন্ন হয়ে ওঠে পাঠকের কাছে। তার নিজের ওয়েবসাইটে নিজের সম্পর্কে রেখা আছে : the offishul web site 4 bill bissett.

বিল বিসেটের পাঠক মাত্রই খেয়াল করেছেন ভেঙে ফেলাটাই বিলের ধরন। ভাঙাভাঙির এই কাজটি লেখক বিলের ক্ষেত্রে এমনভাবে প্রযোজ্য যে বইয়ের সব কিছুতেই তিনি ভাঙেন। আকার-প্রকার কোনো কিছুই বাদ দেন না। তার বই—কবিতা বা গদ্যও তাই প্রচলিত চেহারায় উপস্থিত হয় না। লেখা আর ছবিও দাঁড়িয়ে থাকে দীর্ঘকালের ঐতিহ্যকে অস্বীকার করে। মিলে-মিশে একাকার হয়ে নতুন কিছু হয়ে ওঠাই যেন বিল বিসেটের ধর্ম।

১৯৭১ সালে টরন্টো থেকে প্রথমবারের মতো বিলের কবিতা সংকলন প্রকাশিত হয়। সম্পাদক ছিলেন পরবর্তী সময়ে কানাডীয় সাহিত্যের দুই বিশিষ্ট জন ডেনিস লি এবং মার্গারেট অ্যাটউড। শিরোনাম ছিল, ‘নোবডি ওনস দ্য আর্থ’। এর আগে ততদিনে চৌদ্দটি বই প্রকাশিত হয়ে গেছে। পাঠকেরা বুঝে ফেলেছেন বিলের রচনার ধরন।

বিল বিসেটের কবিতার বই ‘দ্য বুক’-এর একটি পৃষ্ঠা।

১৯৭২ সালে প্রকাশিত হয়েছিল বিলের বই RUSH : What fuckan theory: a study uv language। সে বইটির ১০৩ পৃষ্ঠায় ১৯৬৩ সালে প্রকাশিত বিলের একটি প্রবন্ধ আছে। প্রবন্ধটি প্রকাশিত হয়েছিল ‘blewointment’ পত্রিকায়। অক্টোবরে প্রকাশিত সেই সংখ্যাটিই ছিল পত্রিকাটির প্রথম সংখ্যা। প্রকাশক ও সম্পাদক ছিলেন বিল বিসেট নিজেই। পাঠকের সুবিধার জন্য সে প্রবন্ধে প্রথম কয়েকটি লাইন উদ্ধার করছি :

                              you began what is justice which means                   what can we know                               Margaret Peterson... the forces are immutable                   which means what is eternal to which mean refer                               the question variously answered                   asked by everyone

এই যে কবিতার আকারে এবং কাব্যভাষায় ‘আর্টিকেল’ লেখার প্রয়াস সেটাও কিন্তু বিলের ক্ষেত্রে ‘হঠাৎ’ কিছু নয়। বরং ক্রমে ক্রমে তার ভেতরে শিল্প-সাহিত্যের তাবৎ অনুষঙ্গের মিশেল শুরু হয়। Rush-এর ব্যাকফ্লাপে তাই দেখছি মাইকেল টার্নারের একটি শংসারচনা। মাইকেল লিখেছেন :

At a time when pictures are read more than books, where every writer is a [tele phone and every reader is a designer, Rush : What fuckan theory is instantly recognizable and therefore an important reminder of an era when Poetry, Music, Painting and Dance hang out together, spoke the same language, argued, made plans…

মাইকেলের এই কথার মধ্যে বিল বিসেটের মতো প্রচল-বিরোধী লেখকের আসল ছবি ফুটে ওঠে যথাযথভাবে। ছবি, ছন্দ, শব্দ, অক্ষর, বর্ণ কেমন করে একাকার হয়ে নতুন একটি সাহিত্য বা শিল্প মাধ্যম হয়ে ওঠে।


কবিতার প্রকাশ, উদ্দেশ্য, প্রতিবন্ধকতা ইত্যাদির ওপরও আলোকপাত করেছেন বিল।


আপাতভাবে মনে হতে পারে ভাষার এই ভাঙচুর অনেকটাই পাগলামি। আমাদের মতো সাধারণ পাঠকের কাছে তেমনটি মনে হওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। তবে বিলের কাছে এর সব কিছুর ব্যাখ্যা ছিল। লেখালেখি শুরুর ১০ বছরের মাথাতেই বিল সে ব্যাখ্যাতে নিজেকে নিহিত করেছিলেন এবং সে অনুযায়ী বাকি চার দশক সাহিত্য নিয়ে মেতে আছেন। Rush-এর ভেতর ১৩ পৃষ্ঠায় সে ব্যাখ্যাটি আছে। ৮৭ পৃষ্ঠায় শুরুর সে ব্যাখ্যায় বিল বিসেট বলেছেন :

when yu want to know what writing is more than anything yu look at writing

th emphasis on correct spelling and non phonetik too in any way and on punctuashun wher none is necessary and all the other kind uv obscene rules abt parts uv speech is an attempt thru infinity ur rules to make it impossibul for peopul to have control ovr

ther own media uv language.

ভাষা ব্যবহারে ক্যাপিটাল, স্মল, বানানের রীতি, বাক্য গঠনের রীতি, যতিচিহ্নের ব্যবহার সব কিছুর ভেতরের মেকিত্বকে একে একে তুলে ধরেছেন বিল এই দীর্ঘ প্রবন্ধে [?। প্রচলিত ওই নিয়ম-রীতি কিভাবে সাহিত্যকে যথাযথ প্রকাশে বাধা দেয় সেটিকেও স্পষ্ট করেছেন তার দৃষ্টিকোণ থেকে। কবিতার প্রকাশ, উদ্দেশ্য, প্রতিবন্ধকতা ইত্যাদির ওপরও আলোকপাত করেছেন বিল। আর এভাবেই কাব্যিক ভাষায় লিখিত বানান-বিরতীচিহ্নের নিয়ম ভেঙে লেখা এই প্রবন্ধটি যেমন ‘কবিতা’র সত্যিকার সংজ্ঞাকে মূর্ত করে, তেমনি একজন দীর্ঘযুগের নিবেদিত প্রাণ কবির সামগ্রিক বোধকে উন্মোচন করে।

সবশেষে, বলে রাখা উচিত হবে যে, তিনি খুব অল্প কয়েকজন সফল কানাডীয় কবির একজন যিনি একবারও গভর্নর জেনারেল পুরস্কার পান নি; যদিও দুইবার ডরোথি লিভসে কবিতা পুরস্কার পেয়েছেন, মিল্টন অ্যাকর্ন পুরস্কার পেয়েছেন, কানাডীয় সাহিত্যে সারাজীবনের অবদানের জন্যে পেয়েছেন জর্জ উডকক সম্মাননা। ‘কানাডীয় কবিতার গডফাদার’ বিল বিসেটকে নিয়ে মরিন জাজ সিনেমাও করেছেন ‘হার্ট অব অ্যা পোয়েট’ সিরিজে। সবশেষে বলি, একাধারে কবি ও চিত্রকর বিল বিসেট কিন্তু ‘পারফরমার’ হিসেবেও কম যান না।

সুব্রত কুমার দাস

সুব্রত কুমার দাস

জন্ম ৪ মার্চ ১৯৬৪; ফরিদপুর। ইংরেজিতে স্নাতকোত্তর। পেশায় লেখক। প্রকাশিত বই— ১....বিস্তারিত

এই লেখকের সব লেখা