উগ্র নাশকতার দিনে

উগ্র নাশকতার দিনে ❑

মাথা নুয়ে পড়ে থাকি—নিদ্রা যাই জানালা উজাড় করে ঢুকল কি                        টমাহক পিলজুস? সবটাই আজ যুদ্ধ যুদ্ধ মেহেরুন সুর করে ঘোড়া ছোটে—পলাশীর দিকে তুমি আমি মাঝখানে পাথর ও ফুল! কোথাও একটা কবরের জন্য রয়ে যাব ডেকে আনব গায়ক কুবো পাখিদের। আমার শরীরভরা ঝুম জলপাই ঝুম                        কিসমিস ধানের গুঞ্জন। এত সময়কাতর অ্যামবুশের দুপুর যে ঘরে ফেরার গল্প বলতে পারছি না। বারুদের নামে সবকিছু তুষার কফিন। হায় কলম্বাস—তোমার গল্প থেকে তিমি মাছের চোখ— পাগল বানিয়ে দিচ্ছে হারানো সাঁতারুদের। আমার এখন কী যে মাতম লাগছে ভেজা মাটি বুঝি ভুলে থাকা একটা করাতকল পিঁপড়ে হয়ে ঢুকে যাচ্ছে কলিজার ওপারে। আমার কিছুই মনে হচ্ছে না ঘাতক— এইসব শব্দ—রক্তমঞ্চ আমাদের নিত্য ঘরবাড়ি! রাস্তা—সমস্ত পায়ের পাতা থেকে মাংস ঝরে পড়ে! কী যে খা খা পিচপথ যেন গুঁত্তা করে কাছে আসে ঈগলের গামবুট। ঘাসের আঙুল, গোলাপের ঠোঁট—বালিয়াড়ি সবুজ—নাই বা বলি শুধু একটি শরীর কলাগাছ ধপাস সমুদ্রে পড়ে। ধরো যা দেখছি তার সবটুকু হায়াতুত দুন-ইয়া ছাই ভস্ম হেলেপড়া বিকালের সূর্য তোমার আমার মধ্যে দূরত্ব একটি মেডুসার চোখ। আচমকা এসে টান দাও! যেন চোরাগুপ্তা, মায়াবী হামলা। আমার কলিজা শুধু ঠিকানা তোমার বাকি থাকুক একলা একা জবাপাখিদের ঘুম। তাদের নৈঃশব্দ্য দেখে পড়ে থাকব নিরস্র কোনো আঙুর খুলেও দেখব না তার জন্ম আশৈশব শুধু একটি ছায়ার পালাগান শুনে চেয়ে নেব পথ।

ঘুম ভাঙার পর ❑

রক্ত—এইসব হারাকিরি থেকে বেরিয়ে দেখছি কুয়াশাখিলানের সাম্বা, কোরাস। তুমি গান লিখো আর ঝুমা পাখিদের দাওয়াত দাও। আজ কলাপাতায় জিকির করছে কি সহস্র নমরুদ? দেখো ব্রিজ খুলে এসেছে এসেনিনের মাছ। তার গন্দ শোঁকো, দেখো কানকোয় ঝাপটায় কত সুমেরীয় সূর্য! আমি হযরত সেজে বসে আছি যুদ্ধ-তামাম ময়দানে। দেখছি আবরাহার হাতি—আবারাহি পতন। দেখছি একটি ঘোড়ার জিন থেকে লাফিয়ে পড়ছে লাল শীতকাল! তোমার কি শুধুই তরবারি লেখা? তোমার কি ঝুল জুলেখার আপেল গাছ? এসব সরাও, কবরে পৌঁছাও। আজ ঝুলন্ত মিম্বর থেকে ভেসে আসছে সমুদ্রতারাবির মিশকাত? আমি কবুল বলি, আমি কবুল বলে                 সবুজে সাজাই লক্ষ পিঙ্গলের ধারাপাত।

আমার ভায়েরা ❑

আমার ভায়েরা শুধু মরে যায় আমার ভায়েরা স্বল্প হায়াতের গাছপালা ইয়া মা’বুদ আল্লাহ! বুঝি তারা কুরোশিয়ার সিনেমা যেন-বা ডাকাত কাটে ঘ্যাচাং ঘ্যাচাং আমার ভায়েরা ঝরে পড়ে পাইন সবুজ সমারোহ যেন অতিনম্র কলাগাছ—আজরাইল করে জান                                             ফালা ফালা। আমি কি করে বান্ধব করি গোরা এ ফিরিঙ্গিদের সবই বিদেশি মুখ সবই পাঞ্জাবি সেনা— যেন সাক্ষাৎ নমরুদ—তরবারি খাড়া করে—                            কলিজা নিকেল-কানা। ওরা চায় জাত পরিচয় চায় আইডি ম্যাপের কারিশমা জন্ম জন্ম আমার গোয়েন্দা-পুলিশহানা আমায় মেরেছে উচ্চাসন-জেব্রাগলা আমায় মেরেছে সর্প-কুমারীর বালাখানা। দেখি উটপাখি হয়ে যায় মুখ— দেখি আয়নায় এ-কার চেহারা! আমি ভাতৃহীন—আমার দিল দিল ছায়া-সহোদর যেন ছেড়ে দিয়েছি পাখি—নীল বরাবর যায় সপ্ত আসমান উড়ে যায় সাথে আমার বত্রিশ গিঁট খুলে যায়। আমি  ফাঁকা—আমি গুলিস্তানের কামান পরিত্যক্ত বুঝি কোনোদিন ছিলাম না রূপসী বাংলার ছিল না ঝরোয়া—ঝিল বিল আত্মীয় আমার যেন সত্য হয় সফোক্লিসের দৈববাণী— হারাব স্বদেশ—দেশ মাতৃখনি। ঘুরব বিজাতীয়—ব্লু লেগুনে—দ্বীপ অস্ট্রেলিয়া                                     দেখব ক্যাঙ্গারু খেলা ভুলে যাব আসমানি ভেলা চড়ে গেছিলাম দূরের চান্দের কান্দি মেলা। জেলিবোন আমার বলছে আফসোসে যেন জীবন-বন্ধন বাইসন চোরাবালি ধাঁধা একবার ঢুকলে হয় না আর ফেরা। আমার ভায়েরা মদ্য মদির হাওয়া আমার ভায়েরা নদ-নদী গাছপালা ইয়া মা’বুদ আল্লাহ! বুঝি তারা জিন-দরবেশ হয়ে মিশে থাকে কবিতায় একটা বেগুনি ঘুড়ি উড়ায় ভোরের জানালায়। আমি সেই ঘুড়িতে আয়না হয়ে ঝুলে থাকি তারা মগ্ন শিষ—মায়ের পেটের রক্তভাষা                            পদ্মা মেঘনা যমুনা।

নীলপাখি পলায়ন ❑

আসরের নামাজের পর দু’চোখ অসম্ভব নীলপাখি পলায়ন—ঝিম পাতালের স্পন্দন। এত প্রহর-মুগ্ধ জীবনে হই নি কোনোদিন বসে থাকি পাললিক-লালজিপ কলম-বন্ধ। পাথর উজাড় করে জাগল কি ফুল? জুলেখার চুল সাজল কি মায়ামৃগ-তন্দুর? পাই না সহসা উত্তর! আমার সিপারা-আমপারা বেয়ে ঝরে খুন যেন জন্ম নিয়েছি শত আয়াত আবিরে উত্তর থেকে উত্তরে গোলাবারুদের ঝনঝন। দূরে উড়ে আজনবি ছায়া—প্যাপিরাস গাছ আমাকে শেকড় করে—সাদা মসজিদ—দূত কবুতর। আমি কি তালাশ করি নিষিদ্ধ হারেম—খুশবু গোলাপের মুখ—পায়জামার শেকড়? যাকে চাই তাকে কেনো পাই না আড়ালে আবডালে? এ কেমন স্বাধীন বন্দি আমি—জেলখানা খোন্দক? আমি  মজনুন-জিবে খুন, কানামাছি ফকিরের গুনগুন যদি জল-শুনি হাঙরের লীলালাস্য, কুমারী তর্পণ। তবু ভাষা শুনে মাছগন্ধ—খুলে পাতালের যোনিপথ শীতদেশ ক্রস করে এল কি মাসনবী-মায়াজল? আমরা তো বানু আব্দের দল—বাকি সব ছল যাকে ভাষা দিই—তার গ্রামজুড়ে ফোটে দূরাচারি কার্পাস ফল।

পিপাসা-মথ ❑

ভারতীয় কবিতা ব্যবস্থায় একটি পিপাসা-মথ লিখে দিতে চাই। তার খোলস ভেঙে চোখে মুখে হরিণশিশু বা নিদেনপক্ষে বুকের কাছে লাল মোরগ সবুজ রেশমদিনের গল্প— এরকম কিছু রেখে দিতে চাই। কিন্তু সকাল হলে শীত শীতই থেকে যাচ্ছে জবা বা গোলাপের নামে লাল কিছুই আর ফুটছে না। তাই না পাওয়ার হালকা জানালা—পালানো পায়রা কোথা থেকে কোথায় ডানা মেলে ধরছে। আর যোগাযোগ বলতে শুধু শ্বাস-প্রশ্বাসবিহীন এই একটা পেঁচানো লম্বা ইলি—তার। মাঝখানে একটা গান কিভাবে ঝুলে আছে অচেনা পড়শির মতো! বহুদিন ধরে ঘর থেকে দূরে থেকে থেকে পায়ের কাছে পাথর—মেঘনা যমুনা এমন সব জলবাড়ি কিছুই আর নামছে না শুধু মাথার ভেতর একটি হাতি মাহুতবিহীন হাঁটছে পাহলবী চালে।

ঝরে পড়া পাতার খুশবু ❑

কোথাও আমার গান আজ শহিদের রঙ! যেন লাল গোলাপের কাফেলা—নিঝুম কাশ্মির কানন। তোমার বেহালাটা বাজাও আর বাতাস করে দাও। আমি যেন হুদহুদ উড়ে যাই হিমালয় দক্ষিণে! দস্যু কি এসেছে আজ গুলচিরাগ-আখরোট কাননে? সেই কথাই তুমি বলো—হে হাতিসেবি রক্তদাসীরা। যতই পাহাড় থেকে ছিটকে ধরো আলো আর আলেয়া, সব পথই সিপাহি আর মেশিনগানের দিকে যায় আর ভারতীয়রা আসে। তোমার কথার সুরে কখনোই আর হায়েনাদের ক্ষুধা থামবে না। এই গানের ব্যবসা আমি ভালো করে বুঝে গেছি! তুমি সা-রে-গা-মা সা-রে-গা-মা করছ আর সেনাদের পিস্তল, ডাকাতের ছুরি সবই মুখর হয়ে বসে আছে ঝিলম আর চেনাবে। কোথাও আর নিশ্চুপ থাকার জলপাই নেই।

কবিতা ❑

রক্তপাত ছাড়া কোনো কবিতাই হয় না। অথচ তুমি পাখি লিখো। লিখো নারীদের স্তন ও আঙুল। বিবাহদিনের ম্যাজিক আর একটি গোপন চুম্বনের হারাকিরি। আমি কোনো যুদ্ধকরবী ছাড়া কবিতা চিন্তাই করতে পারি না। যেমন কাবিলের হাতে হাবিলের খুন যেমন রোজ আইসবার্গ দিয়ে তরবারির নিচে নেমে আসা নীল নম্র তিমি! আমার খাতায় ভরা লাল ঘোড়াদের জিন। দেখো দেখো কিভাবে আগুন ঝরছে গোলাপের বাগান থেকে! দেখো আমার প্রেমিকা শুধুই এক খণ্ড করাতকল! আজ কোনো পথ ছাড়াই বসে পড়ছি সেয়ানাদের দুরবিনে আর টের পাচ্ছি আমার কবিতার প্রচ্ছদ জুড়ে নেমে আসছে এক দঙ্গল শিকারির সিনেমাঘর ।

আমাকে বাঁচাও ❑

ময়ূর আমাকে ভালোবাসা দাও! আমাকে তোমার তালতমাল হলুদ জাফরানে                                          মমিফুল করো। আমি মানুষের মাংসখেকো প্রাণ, রক্তবলিদান থেকে পালিয়ে এসেছি। আমার শরীর কাটা, আমার নাভিতে পোঁতা শিশু হত্যার ঘুমন্ত টারবাইন। তোমার রঙিন পুচ্ছ থেকে গাছেদের আলো—আমার কী যে মধুর লাগে! যেন তারা সমুদ্র শুশ্রূষা—যেন মৃত্যু শেষে পড়ে আছে শূন্য আপেল বাগান। আমি মাকে ডাকছি—বোনকে পরিয়েছি বেলি চামেলির ঘ্রাণ। আমি মানুষের বাহুভরা কালাশনিকভ, গুপ্ত টমাহক শিশুদের কলহবিবাদ দেখে দেখে ক্লান্ত ও নিথর। আমার মাথায় ইসরাইলিদের অবিশ্বাস আমার হাতে কারবালার বিষাদ। যেন সব হত্যাকাণ্ড  শেষে একা ফিরে আসবে আহত দুলদুল। ইমাম হোসেন শহিদ—দাউ দাউ পুড়ে যাচ্ছে হতভাগ্য কুফা। ময়ূর আমাকে ভালোবাসা দাও। আমাকে নির্ভাষা দাও পল্লবিত তরুরাজি, ছায়ার গুঞ্জন। যেন আমি মুক ও বধির থাকি রাত্রি তারাদের বনে যেন এইসব রক্ত-বিচ্ছেদের পর শুয়ে যেতে পারি                            তোমার পালকে।

শীতের হলুদগুচ্ছ ❑ 

কিছু রোদের গন্ধ পাওয়া যায় আপেলে শুকনো রোদের আঙুল গেঁথে আনে শাদা মেয়েদের স্তন তাহলে রোদের ভেতর প্রথম দুধের গন্ধ-ইলেকট্রন। রোদ পড়েছে টি টি বেয়ে। গ্লেন কলোনির ছাদে তানপুরা মেহেদি—মেখেছে ছায়া। সাজানো সিঁড়ি সামলানো দায়। এক একটি রোদের ভার—সেনাদিনের হাতি। হলুদ রোদের জামা ছড়িয়ে দিয়েছ শত শত ভেতরে জলকপিস—তামান্না খিলখিল জ্যু-মান্না থেকে ঝু-মান্না সবকিছু রোদের। চিরদিন ঘর চেয়েছি রোদের একটা কচি পেঁপে গাছ হলুদ সব মোরগ আমার ভাঙা বাড়ি—যেন কুক কুরু কুক। কবে মার কাছে চিঠি পাঠিয়েছি তখন মা-রোদ পাখা মেলে ফজর নামাজের তাসবিহ তাহলে মা একটা জানালাভরা রৌদ্র।

ভবঘুরেদের পাশে ❑

ভবঘুরেদের পাশে বসে পাহলবিদের গল্প করি তাদের বেগম—তাদের হামামখানা থেকে শাদা একটি পায়রা উড়ে গেল যুদ্ধবিহবল ময়দানে। আশ্রম জ্বলছে শ্রেণি লেখাদের হাড়ে কোথাও কথা হচ্ছে না—ক্লান্ত ঘোড়ার ক্ষুর থেকে নগর পোড়ানোর শব্দ। নিঝুম এই শিশুমৃত্যু দেখে শিকারিদের ঘরে ফেরার নমরুদ। জলে জ্বলে গোল তামার মুদ্রা গোল গর্ভের ওঠানামা মেঘে। ভবঘুরেদের সেই ক্বাসিদা শিখাই তাদের পোশাক ভরে দিই—বিছানা মাদুলির চন্দ্র। বলি—নিদ্রা হয় শীতের টমেটগুচ্ছ নিদ্রা হয় বিছানাকারীদের চূর্ণ ধুন্দুল। বলি তুলোর গোলাপ নাও রাতে আর উপত্যকাভরা কাবিশ মেয়েদের গল্প বলো।

কিছু জন্ম ❑

রৌদ্র ও গানের পাখি কোথায় রয়েছে? খুঁজে খুঁজে দেখি— দৌড়ানো ঘোড়ার উষ্ণীষ থেকে ঝরে পড়ছে শত্রুদের রুহ! বশ্যতাপ্রবণ আগুন লৌহ কাতরতা জানে! আর আমি জানি একটা ডালিমের লালে ঘুমিয়ে থাকে মায়ের মগ্ন জরায়ু। পিপাসায় পিপাসায় ঘুম জুড়ে তোমার চোখ একটা নদী। টলমল বিরহ আগুন মুগ্ধ ভ্রু পল্লবে। সারাদিন ভ্রমণ শেষে দেখি—ট্রেন থেকে ট্রেনে পিপুল গাছের প্যারা-ট্রানজিট। ৩ নং প্লাটফর্ম থেকে পাখি উড়ছে সোনালি চুলের জানালায়! ভোরে পেঁপে গাছ বেয়ে রৌদ্র তখন সবটুকু বিড়াল।
আবু সাঈদ ওবায়দুল্লাহ

আবু সাঈদ ওবায়দুল্লাহ

জন্ম ৯ সেপ্টেম্বর ১৯৬৫; কিশোরগঞ্জ। পৈতৃক নিবাস রায়পুরা, নরসিংদী। ইংরেজি...বিস্তারিত