মায়া-মীন

এক

যেনবা উঠছে ফসল গোলায় যেনবা রঙিন ধর্ম ফুলের, দূরের সাজনা ডালের দোলায় হাওয়ায় নড়ছে কাপড়—উলের। ডালিম-আনার পাকছে টিলায় নদীর উপরে প্রলেপ সরের, হরেক রতন সাধনে মিলায় দরজা মেলো রে পুবের ঘরের। বাগানশীর্ষে বইছে পবন ধীরজ বালিকা শরমে লুকায়, নরম সুতায় বুনছে কুশন মাঠের রইদে শরীর শুকায়। উড়ছে রঙিন ফুলেল শেমিজ ঘরের আড়ায় পরান পসার, বুনছে গোপন মায়ার দ্বিবীজ যেনবা হৃদয় মাটির তয়ার।

দুই

ভোর আসে যেন নদী ফেটে ডিম বার হয় এক মুখ রাঙা নিম। জংলা থেকে এল কারুময় বায়ু নিরাকার জিভে চেটে নেয় স্নায়ু। যার ভাঁপে তনু ফুলে-ফেঁপে যায় চলে লোকে ফলে নিজ নিজ ভায়। আমি হাঁটি সোজা বাঁকা নদীপাড় গাছগুলি সব পেকে পেকে সার। বাঁধি কূলে একা চারচালা ঘর তার সাথে দেখা মেঘমন্থর, কোনো এক সাঁঝে ফুলদুল পরে ধীরে হেঁটে যায় রুহ গহ্বরে। কে যে রুয়ে দেয় ফাঁকা মনতীরে ভার ভার লাগে যেন দেহঘিরে, বেড়ে ওঠে এক তাজা প্রেমগাছ এসে নদীপাড়ে ধরি এ কী মাছ।

তিন

কুড়িয়ে পাওয়া পিতল মাছে কেমন করে পাতিল কিনে বাজার থেকে রাখছি ভরে। রাতের বেলা উথলে উঠে শরীর দোলে শরীর ভরে লাফায় যেন তাগড়া শোলে। কেমন করে থামাই তারে কেমনে রুখি শাওন মাসে একলা কাঁপে পুরুষ দুখি। বলবে কারে এমন কথা, বন্ধু কই নিজের কাছে লুকিয়ে রেখে নিজেরে কই। সহায় হও মৎস্য ওগো সহায় হও হাতের কাছে থেকেও যেন সামনে নও। যেমন করে মেহন করে লাঘব ভার সত্য হোক-না হোক, তবু সান্ত্বনার। শরীরপাখি গাইছে গান কাঁথার ফাঁকে যেমন করে একলা একা কোকিল ডাকে। ছুটছে রোষে নিজের জোশে গোপন শোল পিতল মাছে যখন চুপে কয় না বোল।

চার

আমি সেই জেলে          মনে জাল ফেলে                 বসে রই ধ্যানে। ভালো থাকো মীন        শুভ হোক দিন                 দোয়া মাঙি মনে। পথে পথে ঘুরি            যেন বটঝুরি                 সরে পড়া দূরে। ফাঁকি দিই কাজে        বাজি এসরাজে                 চিনিমিহি সুরে। আমি ফাঁকা ঘর          অবনতপর                 রোদে দিই ঠেকা। তুমি যেন ঝিরি          বস উঁচু গিরি                 চেনা জলরেখা। যুগে যুগে এল           জল টলমলো                 লাজরাঙা গাল। তার পিছে নেচে         জেলে এক সেঁচে                 মায়ামহাখাল।

পাঁচ

আমিও সেয়ানা আছি বসে রই কূলে পিতল মাছের মুখ দেখা গেল বলে। এই তো এই তো করে বার সন গেল আমার লগেতে বড়ু রামীরে পাইলো। রূপের পাগল হয়া ভবদরগায় উথাল-পাথাল ঘোরে বন-মুরকায়। গলায় গলায় ছুরি শানাতেছে কারা পিছুপা হইয়া রয় ভয়ে চিত্তহারা। প্রেমের সাধন বড় রুখাশুখা লাগে খুঁজিতে গেলেই যেন চুপেচাপে ভাগে। বনের মোরগসম গৃহবাসে এসে খাঁচায় আটকা রই নয়া পরিবেশে। খোঁজাই হইলো সার পাওয়া বড় নয় আমিও তালেই সেই আছি অতিশয় ধীবর সেজেছি তাই প্রেম-দরিয়ায় পিতল মাছের কাছে সঁপি দেহকায়।

ছয়

কেউ কোনোদিন তারে দেখে নি কেউ শোনে নাই নাম কল্পনা থেকে এনে আমিই তারে হৃদে বসালাম। নদী খুঁজে নিয়ে আসি ডিঙায় বেজে ওঠে সুর কোনো লোকে বলে তাই মাছ নয় এ হতে পারে দেও-দানো। আমি ভাবি সারাদিন ধরিয়া ঘড়া কাত করে রেখে দ্রিম করে মাথা ঘুরে গেল যে ঘুম দিই বাম মেখে। ঘুম ঘুম চোখে আসে যেন কে নিজ রূপ সাথে নিয়ে আমি বুঝে যাই এল কেন সে বলে কথা রস দিয়ে।

সাত

কাজে ডুব দিই, ভুলে থাকি চোখে পড়ে বড় নিমগাছ রোদে কাঁপে পাতা—একা পাখি ডেকে চলে কারে—তার আঁচ, মনে দেয় ঘাঁই সহসাই ঘিরে ধরে যেন মীনভোর ফোঁটা ফোঁটা পানি—রোশনাই ছেয়ে ফেলে মাঠ—ঘরদোর। নদী ছুঁয়ে আসা হিমহাওয়া খালি গায়ে মাখি, চোখ বুঝে ভোগ করি তার রূপে ছাওয়া কোন অঞ্চল—রোখ মজে। ফলে ফিরে আসে হৃত ধ্যান কাদাজলঘ্রাণ—কাঁসামুখ প্রেমে পড়া লোক যেন শ্যেন— চোখে ধরে রাখে মায়া-সুখ।

আট

কোথায় চলেছে আজ মেঘের ছায়ার মতো মীন, বিলের কপাল ছুঁয়ে গড়িয়ে পড়েছে ভেজা দিন। ঘরের আড়ায় রাখি পুরানা কাগজ হাতে ঠেসে, পিতল মাছের রানি কাদার গভীরে দেহ পোষে। কাদার শরীর ছেনে পেয়েছি কাঁসার ছেঁড়ানথ, ঘুমের ভেতর যেন হারিয়ে গিয়েছে স্বীয় পথ। কচুর পাতার পানি যেভাবে গড়ায় ঠুমরি চালে, কাদায় পিছলায় ক্রমে জলের কুমারী মৃদু তালে। পিয়াসা মিটাই আমি জলের পিপার মুখা ছুঁই, বকুল খুঁজতে এসে কুড়িয়ে পেলাম ভেজা জুঁই। হাটের গভীরে গিয়ে তামায় দিয়েছি মন বানা, জীবন বাঁধাই হলো নতুন চলনে ষোল আনা। পুরানা দিনের গাছে পেকেছে নরম আতাফল, দরজা খুলেই দেখি হাওয়ার কিনারে ভাসে ছল। যেনবা রয়েছি বসে মনের গদিতে—পায়াহীন, বয়স যাওয়ার মতো কোথায় লুকালো মায়া-মীন।
মূল পাতার লিংক : পরস্পর ঈদ আয়োজন ২০২০
মোস্তফা হামেদী

মোস্তফা হামেদী

২৭ আগস্ট, ১৯৮৫; ফরিদগঞ্জ, চাঁদপুর। স্নাতক ও স্নাতকোত্তর, বাংলা, ঢাকা...বিস্তারিত