হাওর
আক্তাপাড়া গ্রামটা দেখতে প্রিয়তার বুকের কালো জারুলের মতো। চারপাশে হাওরের পানিভরা সাদা বুকের মাঝে এক চিমটি কালচে-সবুজকে এছাড়া আর কীইবা বলা যায়?
ঘুম থেকে উঠে বাইরে পা ফেলে প্রতিদিন যখন যেদিকেই তাকাবে, চোখ পড়বে ঐশ্বর্যময়ীর জলেভাসা সংসারে। সে বৈচিত্র্যবিলাসী চপলমতি নারীর মতো। কখনও ডুবায়, কখনও ভাসায়, হাওরবাসীকে নিয়ে ছিনিমিনি খেলে। তাই এক ধরনের বৈরাগ্য আছে হাওরপারের মানুষের স্বভাবে। ভরা হাওরের বুকে উপুর হয়ে পড়ে থাকা আকাশের মতো প্রেম ও উদারতা তাদের সহজাত অভ্যাস। হাওরের ছলাৎ ছলাৎ ঢেউ, শোঁ শোঁ হাওয়া কিংবা শীতের দিগন্ত ছোঁয়া সবুজের মাঝে ধীরে ধীরে মরতে থাকা দিনটার লাল রোদ দেখতে দেখতে কেউ গান বাঁধে।
সৃষ্টির মাঝে স্রষ্টা তুমি, তাই মানুষেরে ভালোবাসি।
হঠাৎ উত্তর থেকে নেমে আসা ঢল কিংবা টানা বর্ষণে রাতারাতি হাওরের পাকা ধান ডুবে গেলে মানুষেরা পাথর চোখে তাকিয়ে থাকে। সেই শূন্য দৃষ্টির সীমানায় জীবনকে শুধু অর্থহীন লাগে। ঘরে ঘরে বাতি জ্বলে না, চুলায় ভাত ফুটে না। অথৈ অন্ধকারে ডুবে ডুবে, নিষ্ফল আক্রোশে তারা নিজের বুকটাকেই ক্ষতবিক্ষত করে।
সংগ্রাম করে বাঁচতে গিয়ে, প্রকৃতির অপার দান, নিষ্ঠুরতা ভরা রঙ্গ হাওরবাসীকে উদার হাতে দিয়েছে মানব জনমের শাশ্বত বোধ, চেতনার সুর, রহস্যময়তা, খেয়ালিপনা ও নিষ্ঠুরতা। তাই উত্তরের নীল পর্বতের মতো হাওরের পাড়ে পাড়ে নীরবে জ্বলতে থাকে এই দেশ। তাই তো এখানে এত গান, এত ধান, এত কষ্ট ও প্রেম।
২৩.০৭.২০২১
কুল্লুম কুল্লুম
পাঁচ ভাইয়ের পরে আমার জন্ম। তাই খুশির চোটে বাপ-মা নাম রাখল, পারুল। কালো মাটি আর কালো কালো মানুষের দেশ, এই হাওরের দেশ। আমিও তাই কাজলবরণ। পতি থাকে মরুর দেশে।
যখন রাত নামে। অন্ধকারের অতল থেকে কালের কামনায় ডুকরে ওঠে হাওর। উন্মাদ বুকের হাহাকার ঢেউ হয়ে হোমাস হোমাস করে সারারাত মাথা ঠুকে আমার ঘরের পৈথানে। ভাটির দেশের যৈবতী কন্যা আমি। গতর ভরতি হাওরের রঙ্গ-লিপ্সা আর আগুন। তাই কামনা-সিক্ত আমিও মাথামারি গো...। বিষাক্ত আলদ সাপের মতো গতরটা সারারাত মোচড়ায় আমার। পাশের ঘরের দেবর আমাকে শুনিয়ে শুনিয়ে খেলন ফকিরের গান গায়। উসকায়।
প্রাণ বন্ধু দেশে নাই গো, সখী, রহিল কোথায়। অভাগী বন্ধু ছাড়া, বাঁচা বিষম দায় গো। ... যখন নিঝুম দুপুর নামে। সোনার বরণ রোদ ঢেউয়ে ঢেউয়ে খলখল করে হাসে। হেই... আসামপুরের দিক থেকে কলকল করে ছুটে আসে বাতাস। পাগলা বাতাস বয়ে আনে বিরহী কুড়াপক্ষীর কুল্লুম কুল্লুম সুর। আমার বুকে খালি রোদন ওঠে গো, পক্ষী রে... পক্ষী, তুই তর বন্ধুরে ডাকছ?
বিকালে হাওরের দুনিয়া লালে, নীলে একাকার। আসমানের নীল, মরা সুরুজের লাল মিলেমিশে আচানক হাহাকার...। হাওরের বুকেও রোদন, বাতাসেও রোদন। ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি উড়ে আকাশে। এই গাঁয়ের নায়রি শখ করে হেই গাঁয়ে যায়। নাওয়ের আগা গলুইয়ে বসে পতিধন রক্ত শাপলার লাল ফুল তুলে দেয় তার হাতে। পানের রসে ভেজা লাল ঠোঁটে ঝিলিক দেয় রঙিন হাসি। পাছা গলুইয়ের আধাবুড়া মাঝিটা নাওয়ের হাল ধরে গান গায়।
পাড়াগাঁয়ে বসত করি, সামনে ভরা নদী। সঙ্গে যাইতাম অ মাঝি ভাই, ঘাটে নাও ভিড়াইতায় যদি। উড়াইয়া যাও রঙ্গের বাদাম, মনে লয় সঙ্গে যাইতাম, যেথায় গুননিধি। ... ২৬.০৭.২০২১
অলম্বুশ ভুত
অতঃপর রেল স্টেশনের পাশে মেথরদের আড্ডাটা বাংলা মদে জমে ওঠে। অপেক্ষাকৃত তরুণ মেথর রগুদাস কহে, দ্যাখ দ্যাখ, মাইয়াডা কী ছুন্দর!
পাকা ভ্রু কুঁচকে রামেশ্বর কহে, ওছব দ্যাখতে লাই, ওহাতে পাপ আছে। ওহারা সাহেব মানুছ, ঘি-গু খায়, লেপ-তুছকে ঘুমায়, পরী ধরে, ফুল হয়। হামারা ছোট জাত আছি, শাক-শুঁটকি খাই, পেতনি লইয়া মাটিতে ঘুমাই, ভুত হয়, কাইল্যা অলম্বুশ ভুত...