সাহিত্য সম্পাদকের টেবিলে
না না, কিচ্ছু হয় নাই, ভোলানাথ! কাগজটা একপাশে সরিয়ে রেখে সাহিত্য সম্পাদক (সাস) সাহেব বলেন, কী লিখেছেন এসব! রবীন্দ্র নজরুল জীবনানন্দের প্রভাবে ভরা! এখন কেউ কি আর এভাবে কবিতা লেখে?
ভোলানাথ মাথা চুলকায়। আমতা আমতা করে, কিছুই হয় নাই!
কিছু একটা তো হয়েছে। কিন্তু আধুনিক কবিতা হয় নি। আধুনিক কবিতা কাকে বলে বোঝেন?
ভোলানাথ কিছু একটা বলতে যায় কিন্তু তাকে থামিয়ে দিয়ে সাস সাহেব বলতে থাকেন, জানি জানি কী বলবেন। বলবেন ইংরেজি কবিতা অনেক আধুনিক। আপনাদের এই সমস্ত কলোনিয়াল মাইন্ডসেটের কারণেই আপনাদের হাতে কবিতা হয় না। অথচ দাবি করেন, আধুনিক কবি! আজকাল তো আবার কবিতা লিখে ব্লগ না ফেসবুক ওয়াল-টোয়াল কী যেন আছে না, ওখানে দিয়ে দেয়ার হুজুগ পড়েছে। আধুনিক কবিদের আখড়া ওখানে। আপনার ফেসবুক অ্যাকাউন্ট আছে না, ভোলানাথ?
জি, আছে কিন্তু...
ভোলানাথ কথা শেষ করার আগেই সাস সাহেব তার কথা টান মেরে নিয়ে নেন, আরে জানি তো। আজকালকার কবি আপনারা, ফেসবুকে না থাকলে কি হয়! কবিতা লেখার আগেই বুকে টানিয়ে দিতে চান। দাঁড়ান আপনাকে ফেসবুক-কবিদের কিছু কবিতা শোনাই। সম্পাদক সাহেব তার কম্পিউটরের মাউস নাড়াচাড়া করেন। এই যে পেয়েছি—
এত কেন ঘোড়া দাবড়াচ্ছো হে তর্কবাগীশ? তোমার দিকেই চেয়ে আছে যখন আগ্নেয়াস্ত্র সুন্দর। ওই টোটাবন্দুক হাতে যারা শিকার করছে খরগোশ, ঘন ঘন নিশানা পাল্টাচ্ছে— তারা ছড়াচ্ছে কপট ত্রাস। স্যাংচুয়ারিতে নির্মম শুরু হচ্ছে মৃগয়াপর্ব। কিছু দেখলেই লোকে বলছে—ফায়ার !
(ট্রিগারহ্যাপি, আন্দালীব)
কিছু হয়েছে? আপনিই বলেন? বিদেশি ওয়ার্ড দিয়ে বাংলা কবিতাকে পুরা ফায়ার করে দিয়েছে। আরেকটা শোনেন—
একদিন একটা দোয়েল বা ফড়িংয়ের সঙ্গে পালিয়ে যাবো— একদিন একটা দোয়েল কিংবা ফড়িংকে সঙ্গে নিয়ে পালিয়ে যাবো। মন এইভাবে স্থির করা আছে।... ...একদিন একটা ভাত ফোটার মতো সাদা ভোরের সঙ্গে পালিয়ে যাবো—
(মন এইভাবে স্থির করা আছে, ফারুক আহমেদ)
কোথায় ভাত আর কোথায় ভোর! কবি আকাশে হাতি ওড়াতে চেয়েছেন আর কি! আরেক কবি বিদেশে বসে বসে ডিজিটাল কবিতা লেখেন—
মেঘ চচ্চড়ি খেয়েছেন, সমীরণ ভাজি, বজ্র ঘন্ট, শিশির ভর্তার সাথে কুয়াশার ডিম খেয়েছেন... ...কোকের বদলে এক গ্লাস ঠান্ডা জোছনা
(নরখাদক, মূর্তালা রামাত)
রেস্টুরেন্টের খাবার মেন্যু তুলে দিলেই কবিতা হয়ে গেল? আরো শোনেন—
একটানা বেশি দিন কান্না চেপে রাখলে মানুষ একটা বাষ্পরেল হয়ে যায় পাহাড়ি স্টেশন থেকে ঝাঁপিয়ে পড়া ছাড়া তখন আর কোনো গতি থাকে না তাই দেখে কৈশোরের প্রেমিকারাও একদিন হয়ে ওঠে সুদৃশ্য প্রেসারকুকার
( কান্নাব্যঞ্জন, মাজুল হাসান)
প্রেমিকারা প্রেসারকুকার... হা হা হা...উপমার কী অবস্থা, সাস সাহেব গলা খুলে হাসেন। হাসতে হাসতে তিনি আরেকটা কবিতা অাওড়ান—
প্রেম এক মায়াবী ম্যাকিয়াভিলিজম। নৈশ স্কুলে ভর্তি হওয়া গুটিকয় শাদা ফুল এই পাঠ শিখেছে। শিখছে নিরন্তর। না হলে নিদ্রার ভার সুরভি ঘুচায় কেন—যখন ঝিমায় মেট্রোপলিটন?
(প্রেম, সোহেল হাসান গালিব)
কবিতা লিখেছে, নাকি গুগলে কোনো আর্টিকেলের ট্রানস্লেশন করেছে? আবার অনেকে আছেন কবিতায় বিদেশ এনে আধুনিক হতে চান।
পৃথিবীকে, তোমার দিকে হেলে পড়া আশ্চর্য কোনো ল্যাম্পপোস্ট মনে হয়। এই এখন যেমন; ভোর-ভোর, তোমাকে ডেকে তুলছে কানাডার সকাল!
(ল্যাম্পপোস্ট, সজল সমুদ্র)
কানাডা আমেরিকার কথা বললেই যদি আধুনিক কবিতা হতো, তাহলে তো হয়েই যেত। তাই না! এইসব কবিদের কবিতা পড়লে মনে হয়, যা মনে আসে তাই লিখলেই আধুনিক কবিতা হয়ে যায়। শোনেন ভোলানাথ, আধুনিক কবিতা যদি লিখতে চান তবে দেশের বড় বড় কবির কবিতা পড়েন। শামসুর রাহমান পড়েন, আল মাহমুদ, নির্মলেন্দু গুণ, রফিক আজাদ, সৈয়দ হক এদের কবিতা পড়লে আপনার গায়ের রোম দাঁড়িয়ে যাবে। “সোনার দিনার নেই, দেনমোহর চেয়ো না হরিণী”, “আমার শরীরের ছায়া ঘুরতে ঘুরতে ছায়াহীন একটি রেখায় এসে দাঁড়িয়েছে”, “ভাত দে হারামজাদা, নইলে মানচিত্র খাবো”, “একবার পাইবার পর নিতান্তই মনে হয় সোনার মোহর”—কী সব লাইন! এরা এখনো যা লেখেন, এইসব ফেসবুকের কবিরা তার নখের যোগ্যও লিখতে পারে না। এদের বয়স হয়েছে অথচ কবিতার ধার কমে নাই! ভেতরে ভেতরে এরা তরুণদের চেয়েও তরুণ। ভোলানাথ, আপনি এদের নতুন-পুরান সব লেখা পড়ে ফেলুন। তারপর দেখবেন আপনার কবিতার ভাষাই বদলে গেছে।
—ওনাদের শ্রেষ্ঠ কবিতা...
—শ্রেষ্ঠ কবিতা পরে পড়েন। আগে ওনাদের নতুন লেখাগুলো পড়েন। সমসাময়িক বিষয়বস্তুর কাব্যিক গতিপথ বুঝতে পারবেন।
—নতুন কবিতা কোথায় পাব?
—ঈদসংখ্যাগুলোতে দেখেন। প্রথম কয়েক পৃষ্ঠাতেই বড় সব কবিদের কবিতা পেয়ে যাবেন। পড়েন, পড়ে কবিতা লিখতে বসে যান। আমি নিশ্চিত যে, আপনি নিজে তো বটেই, যে কোনো অভিজ্ঞ সাহিত্য সম্পাদক আপনার কবিতার পরিবর্তন দেখে অবাক হয়ে যাবে।
কিছু লিখিবার পূর্বেই তাহার হাত কাঁপিতে লাগিল। তাহার বার বার মনে হইল যে, সে যাহা লিখিবে তা কি আধুনিক কবিদের মতো হইবে?
ঈদসংখ্যা ২০১৫-র সামনে
ভোলানাথ সেদিনই বেশকিছু ঈদসংখ্যা কিনে বাসায় নিয়ে এল। ঈদসংখ্যার প্রথম দিকেই বিখ্যাত সব কবিদের কবিতা রয়েছে। ভোলানাথ রাত জেগে সেগুলো পড়তে থাকে।
আল মাহমুদ
১.
এখন বিরাম ভিক্ষা মাগি জোড় হাতে গো; পারো যদি ছাড়ো আমায় আড়াল খুঁজি তুমি বিনা আমার তো নাই অন্য পুঁজি
( রং লেগেছে অস্তবেলায়)
২.
কিন্তু তোমার ছড়ানো গর্তে নতুন শর্তে আবদ্ধ আমি— আমি চিরকাল আমিই রয়েছি ছন্দে ও মিলে বিশ্ব নিখিলে।
(শব্দে খেলেছি, ছন্দে নেচেছি)
৩.
আকাশের কোলে মেঘের স্তম্ভ বিদ্যুৎ চমকায় বুঝি ওই আসে কালবৈশাখী দমকে গমকে ধ্বংসের গরিমায়।...বলছে প্রলয় আর কিছু নয় আমি ছন্দের রাজা ওরে তোরা সবে ঢাকঢোল নিয়ে বাজা সংগীত বাজা।
(আমিই রাজা)
৪.
দুঃখের পরেও খুব আনন্দ, বাধভাঙা এই হাসি প্রেমের মতো আর কিছু নয়, কেবল ভালবাসি
(থমকে আছে মাতৃভূমি)
সৈয়দ শামসুল হক
১.
ভাবতে ভাবতে দিন ফুরালো, ইতিহাসের নটে মুড়ালো— মানুষ বসে রইলো নদীর ঘাটে। এ নদীটা ইতিহাসের— চলছে খেলা রঙিন তাসের সূর্য এবার বসলো তার পাটে।
(চলছে খেলা রঙিন তাসের)
২.
কী হতো ওই ফণাটি যদি পেত বিষের নীলে আকাশভরা নীল জাড্য তবে কোথায় দূরে যেত! তারায় তারা হাসত খিলখিল!
(নীরবতার কয়েক অক্ষর)
রফিক আজাদ
১.
মাতৃগর্ভ থেকে নেমে কান্না দিয়ে শুরু হয়েছিল জীবন;—জীবন এই নাম মরণেই চিরসখা!
(কোন এক ভাগ্যহতের মৃত্যু)
২.
তিনি তো আছেন আমাদেরই মধ্যে দীনহীন বাস তাঁর দীর্ঘদিন এই সবুজে ও নীলজলে, সমতটে বরেন্দ্রে ও রাঢ়ে...
(সবুজে ও নীলজলে)
৩.
দশতলায় উঠে এসে টানা বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখছিল : সবুজে রঙের একটি বিড়াল এক লাল টেনিস বল নিয়ে লোফালুফি করছে !
(অন্য রকম এক দিনে)
এইসব বিখ্যাত কালজয়ী কবিদের পাশাপাশি ভোলানাথ আরো অনেক নামজাদা কবির কবিতা পাঠ করল।
মহাদেব সাহা
আমি কবিতা লিখবো বলে এই আকাশ পরেছে নক্ষত্রমালা, পরেছে রঙধনু-পাড় শাড়ি, অপরূপ চন্দ্রহার নদীর গহনা পরে আছে গ্রামগুলি, শুধু আমি কবিতা লিখবো তাই এই প্রকৃতি পরেছে পুষ্পশোভা, কানে পরেছে ফুলের দুল, হাতে ঝিনুকের চুড়ি।
(আমার কবিতার জন্য)
আসাদ চৌধুরী
১.
ভাটিয়ালি ট্রেনের সওয়ারি বাসের জানালা ধরে শোনে হিন্দি গান...
(দৃশ্য)
২.
স্মৃতিশক্তি খারাপ হ’লে যা হয় ভুল মুখোশ বেছে নিয়েছিলাম শুধু খেসারত গুনতে হচ্ছে
(এমন বিপদেও মানুষ পড়ে)
৩.
এ অন্তরে বৈরাগির লাউ শুধু নয় হীরকের বাত্তি আছে শক্তি তার কম নয়, বুঝি তার খবর পেলে না
(সত্যি জানতামই না)
মুহম্মদ নূরুল হুদা
১.
অন্ধেরা অধিক শোনে, বধিরেরা দেখে ঠিকঠাক— চক্ষুষ্মান কেবল তাকিয়ে থাকে, দেখেও দেখে না; সজ্ঞানী অজ্ঞান চিত্তে স্বর্গে-মর্ত্যে অবাক তাকায়
(অন্ধেরা অধিক শোনে)
২.
বাঁকা জল আঁকা জল, মাঝখানে বাড়ি। গৃহস্থের চালাবাড়ি, হে নগরবাড়ি!
(দখলীস্বত্বের বাড়ি)
সানাউল হক খান
খুব ছোট্ট একটি বচনে অমৃতে-গরলে গিলে খায় উত্তর-দক্ষিণ গোলার্ধ, দশ দিগন্ত তছনছ বারবার ঢোক গিলে তার স্বাদ পায় নি কেউ
(প্রেমপরমেশ্বর)
রুবী রহমান
রাস্তায় খুব যানজট আনন্দ নিয়ে ঘরে ঈদ আসছে লোকজন মহাব্যস্ত দোকান-বাজারে বছর পেরিয়ে এসেছে রোজার মাস যে।
(একটি দেহাতি গান)
আল মুজাহিদী
প্রহর গোনো হে বন্ধু! কারার প্রকোষ্ঠে দার্ষদ দেয়াল তুলতে দিও না বন্ধু
(বন্দি ও বন্দিদশাহীন)
ফরহাদ মজহার
যতটুকু সাধ্য ঠিক ততটুকু মধু লেগে আছে পিপাসার্ত ঠোঁটে আবার সুযোগ দিও, প্লিজ, আমি মধুভাণ্ডে সর্বস্ব বিসর্জন দেবো।
(আধ্যাত্মিকতা)
রবিউল হুসাইন
মুখ নিঃশব্দ নির্জন অক্ষমতায় নিদারুণ পদশব্দ বিলীন মৃত্তিকায় নিঃশ্বাস প্রশ্বাস বাতাসে মেশে শরীর অশরীরী হয়ে অনতিদূরে অস্তিত্বহীন মূল্যহীন বিমূঢ় বিবর্তনে
(আমাদের বলার কিছু নেই)
হাসান হাফিজ
রক্তক্ষরণের কষ্ট যন্ত্রণা ও জ্বালামর্মতলে কতটা গভীরদ্রাবী বুঝতে হলে ভালোবেসে ব্যর্থ হওয়া চাই
(মাটি মর্ম ভালোবাসা)
হাবীবুল্লাহ সিরাজী
পরিচয় তো পঞ্জিকার, বৈশাখ থেকে চৈত্র রাশিচক্রের তৈলাক্ত বাঁশ, মাউন্টব্যাটেনের ভূত পানিপথ থেকে হাঁটতে হাঁটতে পানামনগর রূপনারাণকে শীতলক্ষ্যায় মিশতে দাও
(পরিচয়)
আসাদ মান্নান
কখনও বা ইচ্ছা হয় পান করি অসামান্য রূপের মদিরা নির্বাক ইশারা ভাষা মরা গাঙে টেনে আনে আশার জোয়ার
( রুমাল কাহিনি)
জাহিদুল হক
দোয়েল-কোয়েল ধূসর শালিক, টিয়া, প্রগাঢ় খঞ্জনা, আমি অই পাখিটির নাম রেখেছি রঞ্জনা।
(রঞ্জনা)
কামাল চৌধুরী
যারা এ শহর তৈরি করেছে সেইসব প্রাচীন জাদুকরদের প্রণাম যারা মানুষের সৃজন ক্ষমতাকে স্বর্গ ও পৃথিবীর মাঝখানে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে তাদের প্রণাম।
(জলশহর)
প্রখ্যাত সব কবিদের কবিতা পড়িবার পর ভোলানাথ কাগজ কলম নিয়া বসিল। কিন্তু কিছু লিখিবার পূর্বেই তাহার হাত কাঁপিতে লাগিল। তাহার বার বার মনে হইল যে, সে যাহা লিখিবে তা কি আধুনিক কবিদের মতো হইবে? অথবা, যাহা লিখিবে তাহা কি সম্পাদক সাহেবের নিকটে আধুনিক বলিয়া গণ্য হইবে? এইসব চিন্তা করিতে করিতে রাত পার হইয়া যাইতে লাগিল।
খানিকটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, বুঝেনই তো, এরা সিনিয়র কবি, যা দেন তাই ছাপতে হয়।
ভোলানাথের আবিষ্কার
সাস সাহেব ভোলানাথকে দেখেই প্রশ্ন করলেন, ঈদসংখ্যাগুলো পড়েছিলেন?
—জি, ভোলানাথ ছোট্ট করে জবার দেয়।
—গুড, ভেরি গুড, সম্পাদক সাহেব হাসিমুখে বলেন, আপনাকে দিয়েই হবে। তারপর, কবিতা এনেছেন?
ভোলানাথ তার দিকে একটি ভাঁজ করা কাগজ এগিয়ে দেয়। সাস সাহেব আগ্রহে ভরে সেটি জোরে জোরে পড়তে থাকেন—
যতোদিন রবে এই বাংলাদেশ
যুদ্ধের মাঠে বিজয় পতাকা ওড়ানো একাত্তর লক্ষ প্রাণের মূল্যে মুক্ত আমার এ বাংলাদেশ না জনাব, যে ভুলে ভুলুক, আমি ভুলিবো না— আমার গর্বের ধন, —আমি কভু ভুলিবো না। মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়েও যাঁরা চেয়েছিল স্বাধীনতা তাঁরা আমাদের ভাই, তাঁরা আমাদের বোন, তাঁরা আমাদের বন্ধু, তাঁরা আমাদের পিতামাতা। খুনের বাঁধন যে খোলে খুলুক, আমি খুলিবো না। আঁধার রজনী শেষে জানি আসিবে সূর্যভোর, যতদিন রবে এই বাংলাদেশ, রহিবে একাত্তর।
পড়া শেষে সাস সাহেব ভোলানাথের দিকে খানিকক্ষণ তকিয়ে থাকেন। তারপর ফেটে পড়েন, ভোলানাথ এসব কী লিখেছেন! আপনাকে না বললাম আধুনিক কবিদের কবিতা পড়েন, রবীন্দ্র-নজরুল বাদ দেন। তারপরও আপনি বৃটিশ আমলের কবিতা লিখে নিয়ে এসেছেন! আপনার পিছে খামোখাই সময় নষ্ট করেছি। না না, আপনাকে দিয়ে কিচ্ছু হবে না! বলতে বলতে সাস সাহেব কবিতাটি দলা পাকিয়ে ভোলানাথের পকেটে ভরে দেন, বুঝলেন, এইসব কবিতা আধুনিক কালের পত্রিকার পাতায় নয়, আপনার শার্টের পকেটেই থাকার যোগ্য, যত্তোসব...
ভোলানাথ হো হো করে হেসে ওঠে।
—হাসছেন যে বড়!
—সাস সাহেব কবিতাটি আমি লিখি নাই।
—আপনি লেখেন নাই তো কে লিখিছে?
—লিখেছেন বিখ্যাত কবি নির্মলেন্দু গুণ। আর আপনার ঈদসংখ্যাতেই তা ছাপা হয়েছে!
—ওহ তাই নাকি! সাস সাহেব নরম কণ্ঠে বলেন, কই দেখি আরেকবার পড়ি তো—বলে তিনি ভোলানাথের পকেট থেকে কবিতাটি ছোঁ মেরে নিয়ে খানিকটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, বুঝেনই তো, এরা সিনিয়র কবি, যা দেন তাই ছাপতে হয়। উপরের নির্দেশ, না হলে চাকরি নিয়েই যে টানাটানি পড়ে যাবে...
—বুঝতে পেরেছি, ভোলানাথ আস্তে করে বলে আর দেখে পুরু চশমার কাচে খানিকটা বাষ্প লাগিয়ে সাস সাহেব মাথা নিচু করে তার ঈদসংখ্যায় ছাপানো যতদিন রবে এই বাংলাদেশ-এর ভাঁজ ঠিক করার আপ্রাণ চেষ্টা করে চলেছেন।