পরের জায়গা পরের জমি

বরাবরই ঘুম পাতলা বজলুর। ইদানীং আরও পাতলা হয়েছে সেটা। বলা তো যায় না, রাত-বিরাতে কখন কোন বাতিক ওঠে পিয়ারা বেগমের। তার পান খাওয়া লাল ঠোঁটের কোণে বড় রহস্য ফোটে আজকাল। বজলু তাতে বেসামাল হয় খুব, টালমাটাল বোধ করে ভারি। নিয়ারা বেগমের কমলা কোয়া ঠোঁটের ভাঁজেও দুনিয়ার সব সৌন্দর্য এসে খাবি খায় যখন তখন। বড় বিপন্ন লাগে, বড় পেরেশানি লাগে বজলুর। বলা তো যায় না কিছু। কে কখন দেখে ফেলে তার ঠিক কী! মানুষ বড় আজব জীব। কারও ভালো তার সহ্য হয় না। কারও সুখ তো আরও না। সত্যি বটে, বজলুর বড় সুখ আজকাল। জাঁহাই সুদিন। তা বজলু করবেইবা কী! সুখ কি সে ইচ্ছে করে ডেকে এনেছে! মোটেই না। সুখই বরং উড়ে এসে জুড়ে বসেছে তার কোলে। ঘটনাটা এতটাই আকস্মিক আর অপ্রত্যাশিত যে বজলু থৈ হারিয়ে ফেলেছিল প্রথমটায়। বড় বিদিক লেগেছিল তার পিয়ারা আর নিয়ারা বেগমের ভাব-গতিক।

গাঁয়ে ধীরু খাঁর নামে বাঘে-মহিষে একঘাটে জল খায়। তার বাড়িতে কামলা খাটে বজলু। লাঙল টানে ক্ষেতে। তার চওড়া-পেটা গতর, যেন ভরা বর্ষার জল থৈ থৈ ঘাট, রুদ্র চৈত্রের কাঠফাটা শুকনো মাঠ। নারীর তেষ্টায় জল হয়ে ঝরবে যে, বর্ষণে শুষে নেবে বিষণ্ণ বাদল। তবু বড় একা বজলু, ছন্নছাড়া। তিন কূলে নেই কেউ, পেছনে নেই ফেউ। ভালোই যাচ্ছিল দিন। তবু হঠাৎ নামা ঢলের মতো সুখ এল তার ঘরে, উছলে পড়ল আনন্দ তার চওড়া বুকের পরে।

মতিভ্রম কি একেই বলে? হবে। আহা পিয়ারা বেগম! কী তার রূপ! কী তার গতরের রঙ! যেন দুধের মধ্যে এক শিশি আলতা উপুড় করে মিশিয়ে দিয়েছে কেউ। যেন ঈশ্বর নিজের হাতে গড়েছে সোনার প্রতিমা কোনো। নাকের নথ নাড়িয়ে যখন সে কথা কয়, দিন-দুনিয়া ক্ষণকাল বুঝি থমকে যায় তার রূপে! খানিক বুঝি জিরিয়ে নিতে চায় তার সৌন্দর্যের ছায়ায়। বজলুর অন্তত তেমনটিই মনে হয়। ধীরু খাঁর মা পুরো তল্লাট গরু খোঁজা খুঁজে তবে পিয়ারা বেগমকে ছেলের বউ করে ঘরে তুলেছিলেন। নিখুঁত প্রতিমা এনেছিলেন ঘরে। দুই দুটি বউ এনেছিলেন তিনি এক ছেলের জন্য। তা সে তো আর ইচ্ছে করে নয়! নিতান্তই বাধ্য হয়ে। বিয়ের পাঁচ-পাঁচটি বছর গত হওয়ার পরও যখন দেখলেন ঘর শূন্য তার, পিয়ারা বেগমের মধ্যে মা হওয়ার কোনো লক্ষণই নেই তখনও, তখনই না ধীরু খাঁকে দ্বিতীয় বিয়ে করালেন তিনি! যত যাই হোক, বাঁজা বউ দিয়ে তো আর সংসার চলে না! তা সে দেখতে যতই চাঁদপানা হোক! ধীরু খাঁর মা নীরু বেগম তাই বাধ্য হয়ে ছেলের জন্য খুঁজে পেতে দ্বিতীয় বউটিও আনলেন কাঁচা-হলুদ বর্ণের, ছোট বউয়ের বাপের দেওয়া নাম বাতিল করে বড় বউ পিয়ারা বেগমের নামের সঙ্গে মিলিয়ে রাখলেন নিয়ারা বেগম। নিয়ারা বেগম হাসলে জগৎ খিলখিল হেসে ওঠে, মুখ ভার করলে আকাশে মেঘ জমে ভারি। ঘরের মধ্যে দুদুটো জলজ্ব্যান্ত চান রেখে তবু বংশের মুখে কোনো চেরাগ না জ্বলতেই পৃথিবীর রঙ্গমঞ্চ থেকে বিদায় নিলেন নীরু বেগম। আর গাঁয়ের মানুষ দুবউকেই বাঁজা ডাকতে ডাকতে আড়ালে-আবডালে ধীরু খাঁকেও আঁটকুড়ে ডাকা শুরু করল ততদিনে। তবু খাঁ বাড়ির জৌলুস কমল না তাতে। পিয়ারা আর নিয়ারা বেগমদ্বয়ের হাসিও ম্লান হলো না মোটেই। নীরু বেগমের দেওয়া ছবক মোতাবেক দু-বউ ঈর্ষার চাষাবাদ ভুলে দু-বোন হয়ে গলায় গলায় ভাব রেখে দিনরাত আমোদে-আহ্লাদে হেসে গড়ায়, দেখে গাঁয়ের লোক আড়ালে ঈর্ষায় জ্বলে আর ধীরু খাঁর কপালকে গালি দেয়।

বজলুর দিনকালও খাঁ বাড়ির জৌলুসে বড় খারাপ যাচ্ছিল না। গায়ে-গতরে দশাসই বেড়ে ওঠা বজলুর বুদ্ধিতেও ধার ছিল বেজায়। সে চেয়েছিল আঁটকুড়ে ধীরু খাঁর বাড়িতে কামলা খেটে, জমিতে লাঙল টেনে নিজের আখের গুছিয়ে নিতে। ধীরু খাঁও বড়ই পেয়ার করেন তাকে। বজলু সৎ, অন্যের সম্পত্তি মেরে খাওয়ার ঝোঁক নাই তার ভেতর। সারাদিন সে গাধার মতো খাটে, দিনশেষে নিজের পারিশ্রমিকটুকু বুঝে নেয় কড়ায়-গণ্ডায়। তাতে কোনো আপত্তি নাই ধীরু খাঁর। বরং বজলুর প্রাপ্যের চেয়ে বেশিই দেন তিনি। খোদা তাকে অনেক দিয়েছেন, গরিবের হক মেরে খাওয়ার ধান্দা করতে হয় না তাকে। বজলু ততদিনে তার জমানো টাকা দিয়ে গাঁয়ের শেষপ্রান্তে এক কানি জমি কিনেছে। ঘর তুলবে সেখানে আর কিছুদিন বাদে, তারপর খুঁজে পেতে লক্ষ্মীমন্ত, টুকটুকে একটা বউ আনবে ঘরে, সুখে কাটবে তার শ্রমিকজীবন। এমন সব দারুণ স্বপ্নে ভালোই কাটে বজলুর সাদামাটা দিন। ধীরু খাঁর বসার ঘরের একপাশের ছোট্ট খুপড়ি ঘরটায় বেশ কেটে যায় তার ব্যস্তসমস্ত সময়। সারাদিনের পরিশ্রম-শেষে সন্ধ্যায় ভেতরবাড়ি থেকে আসা খাবার খেয়ে নিজের বিছানায় শুয়ে ঘুমিয়ে পড়ে বজলু। একঘুমে রাত পার করে দেয় প্রায়। রাত-বিরাতে শুধু এখানে ওখানে খুটখাট শব্দ হলেই যা ঘুম ভাঙে তার, তাতে অবশ্য তেমন কিছু মহাভারত অশুদ্ধ হয় না, খানিক বাদেই আবার গভীর ঘুমে তলিয়ে যায় সে। কিন্তু সেদিন হঠাৎ কী যে হলো বজলুর! বলা নাই কওয়া নাই, মাঝদুপুরে সুখ উড়ে এল তার ঘরে। উড়ে এসে জুড়ে বসল তার মনে, বাজিয়ে দিল হাজারো সুখের তানপুরা।

ঘুম-পাতলা বজলু প্রথমে ভেবেছিল দরজায় বুঝি বাতাস এসে ধাক্কা দিচ্ছে। খুবই মৃদু শব্দটা, শোনা যায় কি যায় না। বজলুর কানে অবশ্য শব্দটা স্পষ্ট হয়েই বাজল। ঘুম ভেঙে গেল তখন তখনই। কান পাতল বজলু। বোঝার চেষ্টা করল শব্দটার উৎসমুখ। একে তো গভীর রাত, তায় অন্ধকার নেমেছে ঘন হয়ে। গা ছমছম করে উঠল তার। গাঁয়ে রাতদুপুরে নিশি ডাকে, মিহিনসুরে মানুষের নাম ধরে ডেকে নিয়ে চলে যায় গাঁয়ের গভীর জলাশয়ের দিকে, তারপর কাদার মধ্যে চুবিয়ে রেখে চলে যায়। ভোরে ঘুম ভেঙে গাঁয়ের মানুষ দেখে জলাশয়ের কাদায়—মুখ নিচে পা ওপরে—পোঁতা আছে জলজ্যান্ত মানুষের লাশ। নিশির ডাকে সাড়া দেওয়ার ফল, ভেবে আফসোস করে তখন গাঁয়ের প্রতিটি নারী-পুরুষ। কিন্তু বজলু অতটাও বোকা নয়। নিশির ডাকে সাড়া দেওয়ার মতো আহাম্মকি সে কিছুতেই করবে না। তারচে বড় কথা, তার নাম ধরে কেউ ডাকে নি, দরজায় মৃদু শব্দ করেছে বড় জোর। কিছুক্ষণ এপাশ-ওপাশ করে আবার ঘুমানোর বন্দোবস্ত নিল বজলু। খানিক বাদে ঘুমিয়েও পড়ত সে অনায়াসেই, কিন্তু দরজার ক্ষীণ শব্দটা আবার শুনল সে, এবার শব্দটাকে আগের চেয়ে একটু যেন জোরালো মনে হলো তার। নিশি কি দরজায় শব্দ করে? প্রশ্নটা নিজের মনেই খানিক উল্টেপাল্টে দেখল বজলু। না, নিশি বড়জোর নাম ধরে ডাকে। কিন্তু তার নাম ধরে তো ডাকে নি কেউ! তাহলে শব্দটা আশলে কিসের?

উঠে অগত্যা সাবধানে দরজাটা সামান্য খুলল বজলু। খুলতেই মাঝ-রাত্তিরের দমকা বাতাসের ঝাপটা একরাশ সুগন্ধি উড়িয়ে এনে ফেলল তার নাকের মধ্যে। সেই সঙ্গে হতচকিত, ভীত বজলুর বুকের মধ্যে এসে আছড়ে পড়ল একদলা সুখ, পিয়ারা বেগম।

প্রথম দিন বড় বেসামাল লেগেছিল বটে বজলুর। বড় টালমাটাল। আসমানের চানকে যে চায় সে তো মানুষ থাকে না আর, সে হয়ে যায় বদ্ধ পাগল, উন্মাদ। তা বজলুর অভাব কিসের? সে কেন শখ করে পাগল হতে যাবে? পিয়ারা বেগমকে দূর থেকে দেখেই তাই সন্তুষ্ট ছিল সে, ছিল দারুণ খুশি। সেই চান যখন স্বেচ্ছায় নেমে আসে বুকে, দখল করে বুকের কোমল জমিন, তখন বড় উচাটন হয় মন, বড় দিশেহারা লাগে পরান। প্রথমটায় তাই পূর্ণিমার বাঁধভাঙা জোছনায় দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে ভেসে গেছিল বজলু। কল্পনার অধিক কিছু পাওয়া হয়ে গেলে বুঝি অমনই ভাসে মানুষ কূলহীন, কিনারহীন বোধে? ভেবে বড় পেরেশান লেগেছিল তার। হঠাৎ উড়ে আসা সুখে ভাসতে ভাসতে তার বোধবুদ্ধি বুঝি লোপও পেয়েছিল খানিক। পরপর কদিন উড়ে আসা এই সুখকে সে ভেবেছিল প্রেম। সে স্বপ্ন আঁকছিল চোখে। সে কল্পনায় দেখছিল ভবিষ্যতের উজ্জ্বল পথ। ধীরু খাঁ সেখানে খল, অনুপস্থিত। সেখানে শুধু সে আর পিয়ারা বেগম, পিয়ারা বেগম আর সে। বাকি সব জঞ্জাল। অপ্রয়োজনীয়। কিন্তু না। তার বুকে উড়ে এল আরও আরও সুখ। উড়ে এল নিয়ারা বেগম।

ঘুম-পাতলা বজলু দরজায় সামান্য শব্দ হতেই তাই ঘুম ভেঙে জেগে উঠেছিল সেদিনও। ভেবেছিল হঠাৎ-চেনা সুখই বুঝি আবার এসেছে ঘরে। সে উঠে অভ্যাসবশে দরজা খুলে সরে দাঁড়াতেই আস্ত আরেক চান আরেক আসমান জোছনা নিয়ে দরজা দিয়ে ঢুকে পড়ল এক পশলা দমকা হাওয়া। চমকে উঠল বজলু। ঘরে ঢুকে পড়া এক-আসমান জোছনার আলোয় আগন্তুক চানটা বড় রহস্যময় হাসিতে নিজেকে ভরিয়ে তুলে তাকিয়ে থাকল বজলুর চোখে। বজলু বড় অসহায় বোধ করল সে দৃষ্টির সামনে। হতভম্ব দাঁড়িয়ে থাকল বোবা চোখে।

অতঃপর দরজা বন্ধ করে দিল আসমানের চান। ঘন অন্ধকারে ছেয়ে গেল ঘর। বজলু টের পেল একতাল কাদা আর অচেনা এক সুগন্ধি আঁকড়ে নিয়েছে তাকে। অচেনা এক সুখ এসে জড়িয়ে ধরেছে আষ্টেপৃষ্ঠে। সেই সুখে ভাসতে ভাসতে বজলু শুনল আসমানের চানটা তার বুকে মুখ ঘষতে ঘষতে তাকে ফিসফিসিয়ে বলছে, কী ভাবছিলা, অ্যাঁ! পিয়ারা বেগম একাই মা হয়া ধীরু খাঁর সব সম্পত্তি বাগায়া নিব! সেইটা হইতে দিব না। আমিও মা হব! হবই!

সুখ বড় পলকা। বড় ক্ষণস্থায়ী। চোখের পলক ফেলতে না ফেলতেই মিলিয়ে যায় লহমায়। বজলুর সুখও লহমায় মিলিয়ে গেছে হাওয়ায়। রাতের পলকা ঘুম ইদানীং আরও পলকা হয়েছে তার। সুখের আশায় মাঝরাতে আচমকা ঘুম ভেঙে জেগে ওঠে সে, দরজা খুলে ইতিউতি তাকায়। না, কেউ কোথাও নাই। আসমানে চান নাই, তারা নাই। পৃথিবীতে জোছনা নাই। সেখানে ঘোর অমাবস্যা নেমেছে বরং। মাঝরাতে পিয়ারা বেগম আর নিয়ারা বেগমের পালা করে ওয়াক শব্দ তুলে বমির আওয়াজে ঘুম ভাঙে তার। ধীরু খাঁর দুই বউ একসঙ্গে মা হবে, তার জানান দেয় পৃথিবীকে। একসঙ্গে পোয়াতি হয়েছে তারা। বজলুর বুক জ্বলে। বড্ড অম্ল জমেছে পেটে। বাপ হতে গেলে কি অমন অম্লের ভাব হয় পেটে? কে জানে! বজলু নিজের মনে ভেবে মরে নিরালায়। ধীরু খাঁর মুখে জোড়া চানের উজ্জ্বল হাসি উপচায়। এক সকালে তিনি বজলুকে ডাকেন। গলা খাঁকারি দিয়ে সবটুকু দ্বিধা ঝেড়ে ফেলে বলেন, তুই এই বাড়িত্তে চইলে যা বজলু। আমি অইন্য কামলা ঠিক করিচি। তোক আর দরকার নাই আমার।

শিল্পী নাজনীন

শিল্পী নাজনীন

জন্ম ১৪ জুলাই, ১৯৮১; কুষ্টিয়া। কবি, কথাচিত্রী। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে...বিস্তারিত