স্বত্ব

‘বাসাটার একটা দারুণ দিক হলো চারদিক দিয়ে খোলা আর প্রচুর আলো।’ ঘরে ঢোকার কিছুক্ষণ পরই কথাটা বললেন দুলাভাই। তাঁর কথায় সায় দিয়ে আপা বললেন, ‘আর ঠান্ডা।’

দুলাভাই সচরাচর প্রশংসা করেন না, ছিদ্রান্বেষী হিসেবে তার বিশেষ দুর্নাম ছিল বলে তার কথায় খুশি হলেও আলগা অনুযোগের স্বরে বললাম, ‘একটু পরই টের পাবেন—এত শব্দ!’
‘রাস্তার পাশে তো আর না, শব্দ আবার কিসের!’ আপা অবাক হয়ে বললেন।
কিছুটা গোমড়ামুখে জানালাম, ‘প্রতিবেশীর। আমার ঠিক মাথার পাশেই যে-প্রতিবেশী, তাদের যমজ ছেলে আছে। মাশাল্লাহ! ওদের যেটা নিষেধ করা হয়, সেটাতেই ওদের প্রচণ্ড আগ্রহ। আমি ইদানীং তাই ওদের সব কাজেই উৎসাহ দিই।’
আমার কথার ধরনে হেসে উঠলেন আপা।
মৃন্ময় জানাল, ‘তুমি হাঁসমুরগি আর গরুছাগলের কথা কিন্তু বলো নাই।’
আপার অবাক চোখের দিকে তাকিয়ে এবার আমি হেসে ফেললাম, ‘আমাদের সব প্রতিবেশীই এগুলো কমবেশি পালে, তাই প্রতিদিন এদের ডাকেই আমাদের ঘুম ভাঙে।’

আপা মানে ছোটো আপা, মানে ছবি আপা, মৃন্ময়ের বাবার সম্বোধনে কেবল ‘ছবি’। ছবি আপা আবিরের চেয়ে বড় হলেও তাকে কখনও ‘আপা’ ডাকতে শুনি নি। এদের দুই ভাইবোনের মধ্যে একটা মানসিক দ্বন্দ্ব ছিল। ইদানীং দ্বন্দ্ব মিটে গেছে—এমনটাও ঠিক নয়। তবে আমি আর মৃন্ময় সম্ভবত এখন সমস্ত দ্বন্দ্বের ঊর্ধ্বে। 

দুপুরে খেতে বসে আপা খাবার টেবিল আর চেয়ারের প্রশংসা করলেন। আমি আট হাজার টাকা দিয়ে টেবিল বানিয়েছি আর বারোশো টাকা করে দারাজ থেকে চারটা চেয়ার কিনেছি শুনে আপার অবাক হওয়ার সীমা নেই, ‘তোমার এত ধৈর্য!’

টেবিলটা চারজনের। আপা, দুলাভাই, ওদের ছেলে আরাবি আর আমি বসেছি। এক্সট্রা চেয়ার দিয়ে অবশ্য মৃন্ময়কেও বসানো যেত, কিন্তু ও এখনও বসতে পারে না। কবে বসতে পারবে কিংবা আদৌ বসতে পারবে কি না ব্যাপারগুলো এখনও অমীমাংসিত। মৃন্ময় তাই বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে খাবার খায়। প্রায় তিন মাস ওকে খাইয়ে দিয়ে ইদানীং বন্ধ করেছি। আমি তো সারাজীবন থাকব না—স্বনির্ভর হতে শিখুক। কিন্তু ওর ভাত খাওয়ার এই অমানবিক তরিকা ঠিক সহ্যও হয় না বলে খাওয়ার সময়টায় ওকে এড়িয়ে যাই।

ছোটো আপা বলেছিলেন, ‘সকাল দুপুর মৃন্ময় নিজেই খাক। রাতে তুমি খাইয়ে দিয়ো, সোমা। উপুড় হয়ে খাচ্ছে বলে দেখো কেমন চাপ পড়ছে পেটে।’
‘বীরত্ব যেমন উপভোগ্য, কষ্টটাও তেমন। দুইটাই ভোগ করা দরকার।’ যেন পেটে চাপ পড়ার বিষয়টা তেমন কিছু না—এমন ভঙ্গিতে কথাটা বললাম।

২
‘বাসাটা ছোটর মধ্যে ছিমছাম, কিন্তু জিনিসপত্র বড্ড বেশি মনে হয়।’ 
দুলাভাইয়ের মন্তব্যে হাঁফ ছাড়লাম। এর আগেও আমার বুকশেলফের প্রশংসা করেছেন বলে অস্বস্তি হচ্ছিল। যাক, অবশেষে তিনি স্বরূপে ফিরে পৃথিবীর নিয়ম রক্ষা করলেন। প্রশংসাগুলোও করছিলেন সম্ভবত বহুদিন পর দেখা বলে। 

ছোটো আপার একটা দারুণ গুণ হলো তিনি সবসময় হাসিমুখে কথা বলেন। আমি তাঁকে কখনও বেজার মুখে কিংবা মুখে হাসি ছাড়া অন্য কোনো অভিব্যক্তি নিয়ে কথা বলতে দেখি নি। ফোনের ওপার থেকেও বেশ টের পেতাম—আপার মুখ হাসি-হাসি। ও হ্যাঁ, শুধু একবার, একবার আপার মুখে বিরক্তির ছায়া টের পেয়েছিলাম, ফোনের ওপার থেকেই। 

কত বছর আগেকার কথা সেসব! মৃন্ময়ের তখন ছ-বছর বয়স মনে হয়। বলেছিলাম, ‘আপা, আমার যা বেতন, সেই বেতনে মৃন্ময়কে নিয়ে বাসাভাড়া করে আর কাজের মানুষ রেখে চাকরি করা সম্ভব হচ্ছে না। আপনি বছরখানেক ওকে আপনার কাছে রাখুন। আমি এক হাজার টাকা সিটভাড়ায় ইউনিভার্সিটির ডরমেটরিতে উঠে যাই। মৃন্ময়ের জন্য মাসে-মাসে দশ হাজার টাকা পাঠাব। একবছর পর আমার বেতন বাড়বে, আমি তখন ওকে নিয়ে আসব।’

এটা নিশ্চিত একটা উদ্ভট আবদার ছিল। নইলে এমন মিনমিনে গলায় কেন বলেছিলাম কথাগুলো? যেখানে ভাইয়ের সাথেই সম্পর্কের টানাটানি, সেখানে ভাইয়ের ছেলের দায়িত্ব নেবে—কার এমন ঠ্যাকা পড়েছে!

আত্মবিশ্বাসের স্তর এতটাই নেমে গেছিল যে ঠিকঠাকমতো গুছিয়েও বলতে পারছিলাম না কথাগুলো। তার আগেই টের পেয়ে গিয়েছিলাম আপার কঠিন আর থমথমে মুখ।
জানতাম তো এমনটাই হবে, তার পরেও কোন আহ্লাদে ফোন করতে গিয়েছিলাম? যেখানে আবার আমার কারণেই তাদের ভাইবোনের দ্বন্দ্ব! 

আপার বেশি বয়সে বিয়ে আর দু-দুবার মিসক্যারেজ; দীর্ঘদিন সন্তানহীন থাকায় আমি মনে হয় ধরে নিয়েছিলাম সন্তান জন্মদানের প্রচেষ্টায় তিনি ইস্তফা দিয়েছেন, ভাইয়ের ছেলেকে কিছুদিন রাখতে আপত্তি করবেন না।

সেবার বড্ড কষ্টে পড়েছিলাম। এখনও ভেবে পাই না সাকুল্যে উনিশ হাজার টাকা বেতনে বিশ্ববিদ্যালয়ে কেন মানুষ মাস্টারি করতে আসত! এই টাকায় ভদ্র উপায়ে কিভাবে একটা পরিবার জীবনধারণ করতে পারে! অবশ্য জীবন কারও জন্যই থেমে থাকে না, নয়তো আমি আর মৃন্ময় কিভাবে এতগুলো বছর পার করে দিলাম! এখন অবশ্য ভালো আছি। জয়েন করার এক বছরের মাথাতেই বেতন বেড়েছিল। দুটি প্রমোশন হয়ে এখন ভদ্রভাবেই বেঁচে থাকতে পারছি। কেবল শুরুর দিনগুলোর কিছু স্মৃতি এখনও কেমন উদাস করে দেয়। বছরখানেক মৃন্ময়ের কর্নফ্লেক্স বন্ধ করে দিতে হয়েছিল, তখন কেবল তরকারির ঝোল দিয়েই ভাত খেতে হয়েছিল আমাকে। আশ্চর্য! বেতন বাড়ার পর—কর্নফ্লেক্স কিনলে টের পাই—এই খাদ্যটায় আর মতি নেই মৃন্ময়ের; আমারও আর মাছ-মাংস খেতে ভালো লাগছে না।

৩
‘তোমার গবেষণার বিষয় যেন কী ছিল?’ আপার প্রশ্নে সম্বিৎ ফিরে পাই।
‘প্রথম দশকের কবিতার গতিপ্রকৃতি।’
‘এমফিল, তা-ই না?’ এবার দুলাভাই।
‘এমফিল আশি-নব্বই নিয়ে, এটা পিএইচডি।’
‘কোথায় করেছ, চিটাগাং ইউনিভার্সিটিতেই?’
‘না, আপা। এটা ঢাকায়। চিটাগাঙের সুপারভাইজার ফ্রি ছিলেন না তখন।’
‘কমপ্লিট?’
দুলাভাই দেখি বাকপরিমিতিবোধের প্র্যাকটিস করছেন। সম্মতিস্বরূপ উপরনিচ মাথা দোলালাম।
‘আলহামদুলিল্লাহ!’

কেন যেন মনে হলো, প্রাণ থেকে উৎসারিত হলো না শব্দটি! কেমন আড়ষ্ট। তিনি নিজে একটি কলেজের ইংরেজির শিক্ষক। আমি অনেক পরে জয়েন করেও পদ ও ডিগ্রিতে তার থেকে উপরে উঠে গেছি—এটা কিছুটা অস্বস্তিকর তার কাছে। মনে মনে বলি, ‘আপনার মতো প্রাইভেট পড়ানোর সুযোগ থাকলে ডিগ্রির পিছনে ছুটতাম না। জীবনে শিক্ষার চেয়ে অর্থের মূল্য অনেক বেশি।’ 


মৃদু হেসে বললাম, ‘সেটা পাঁচ আগস্টের পর। আমার ছেলে গুলি খেয়েছে আঠারো জুলাই। পাঁচ আগস্টের আগ পর্যন্ত আহতদের যারা চিকিৎসা দিয়েছে, তাদের কাউকে কাউকে মারধরও করা হয়েছে।’


৪
আহত হওয়ার প্রায় দুমাস পর মৃন্ময়কে সিএমএইচে নিয়ে গিয়েছিলাম। ক্ষত ততদিনে শুকিয়ে গেছে। কিন্তু তিনশো উনিশটা পিলেটের বেশ কয়েকটা ভীষণ উৎকটভাবে চামড়ার উপর থেকেই তাদের অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে। আমি এতদিনে অভ্যস্ত হয়ে গেছি, কিন্তু নতুন কেউ শিউরে ওঠে। পিলেটগুলোর উপরিভাগের চামড়া কালো হয়ে এমন ফুলে গেল কেন কে জানে! মনে হয় ওর পুরো কোমর জুড়ে কে যেন গরম তেল ছিটিয়ে ফোস্কা বানিয়ে দিয়েছে।

ডাক্তার আক্ষেপ করে বললেন, ‘একেবারে তো ঝাঁঝরা করে দিয়েছে। খুব কাছ থেকে গুলি করেছে?’
‘চার-পাঁচ ফিট দূরত্বে ছিল।’ মৃন্ময় জানাল। 
আমি অভিযোগের সুরে বললাম, ‘ও সারেন্ডার করেছিল, তারপরও গুলি করেছে।’
‘অমানুষের দল!’ 
ডাক্তার একজন ব্রিগেডিয়ার, তার অনুকম্পা উপভোগ করছিলাম। এবার প্রশ্ন করলেন, ‘পুলিশ, না ছাত্রলীগ?’ নিজেই শুধরে নিলেন, ‘নাহ, ছাত্রলীগের গুলিতে পিলেট থাকত না। আল্লাহ বাঁচাইছে পুলিশ গুলি করেছে, ছররা গুলি বাঁচিয়ে দিয়েছে তোমায়!’
এবার অনুযোগের সুরে প্রশ্ন করলেন তিনি, ‘এতদিন আসেন নাই কেন?’
‘আপনারা তো সিভিলিয়ানদের চিকিৎসা দেন না।’
‘আরে কী বলেন! ও ইস্পাহানির ছাত্র। আমাদের দুইটামাত্র শিক্ষার্থী গুলিবিদ্ধ হয়েছে, তার মধ্যে ও সবচেয়ে বেশি ইনজুর্ড। ওর চিকিৎসা কেন দেব না! তাছাড়া আমরা তো সার্কুলেট করে দিয়েছিলাম যে আহতদের চিকিৎসা দিচ্ছি।’
মৃদু হেসে বললাম, ‘সেটা পাঁচ আগস্টের পর। আমার ছেলে গুলি খেয়েছে আঠারো জুলাই। পাঁচ আগস্টের আগ পর্যন্ত আহতদের যারা চিকিৎসা দিয়েছে, তাদের কাউকে কাউকে মারধরও করা হয়েছে।’
‘তা অবশ্য ঠিক। ঢাকায় আমাদের পরিচিত ডাক্তারকে সাসপেন্ড করা হয়েছিল আহতদের চিকিৎসা দেওয়ার অপরাধে। কী অদ্ভুত! ডাক্তারের ধর্মই তো চিকিৎসা দেওয়া। এখন যদি সূর্যকে আলো বিলানোর দায়ে আপনি শাস্তি দেন’... 

কথার মাঝপথেই থেমে গেলেন ডাক্তার। মৃন্ময়ের পিঠের ক্ষতের ছবি তুলে ঢাকায় পাঠিয়েছিলেন, স্কিন গ্রাফটিং করা যাবে কি না জানতে চেয়ে। ঢাকা সিএমএইচের প্লাস্টিক সার্জন ফোন করেছেন। আমি উৎকর্ণ হয়ে আছি, যদিও আমাদের স্কিন গ্রাফটিঙের চেয়ে জরুরি কিছু পিলেট অপসারণ। মৃন্ময় পাঁচ মিনিটের বেশি বসতে পারে না। বিছানায় পিঠ লাগিয়ে ঘুমাতে পারে না। একটু হাঁটলেই হাঁপিয়ে ওঠে। ওয়ারড্রবের উপর খাতা রেখে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে লেখে, বিছানায় আধশোয়া হয়ে পড়ে। এমনিতেই ওর পড়ায় মতি নেই। শরীরী অস্বস্তির কারণে এখন সব মাথায় উঠেছে। তিন মাস পর ওর এসএসসি। এভাবে চললে নিশ্চিত ফেল। যত বলি ‘এবার পরীক্ষা বাদ দাও’, ততই বলে, ‘আমার বন্ধুরা আমার সিনিয়র হয়ে যাবে, তুমি টেনশন কোরো না মা, আমি ঠিক পাশ করব।’ 

কেমনে বলি, ‘শেষ পর্যন্ত পাশের আশ্বাসবাণীই যদি শুনতে হয়, তোর পিছে এত টিচার রেখে কী লাভ হলো!’
‘আচ্ছা, বেঁচে তো আছে। সেদিন যদি মরে যেত!’ মনকে প্রবোধ দিই। সন্তানকে দুধেভাতে রাখার আবদার আঠারো জুলাইয়ের পর থেকে কেটে গেছে আমার। ভারতচন্দ্র বেঁচে থাকলে মনে হয় নতুন করে লিখতেন, ‘আমার সন্তান যেন থাকে সালামতে’। 
মৃন্ময় কেবল বেঁচে থাকুক, একটু কম কষ্ট নিয়ে—এটাই আমার চাওয়া। একেবারে সুস্থসবল সন্তানের স্বপ্ন এখন আমি আর দেখি না।

বন্ধুদের সাথে পাল্লা দিতে গিয়ে পোশাকআশাকে ধোপদুরস্ত থাকতে চায় মৃন্ময়। বিটিএস স্টাইলের ঢোলাঢালা প্যান্ট পরে। ফিটফাটভাবে ওকে ঘুরতে দেখে অনেকেই হয়তো ভাবে ও তো দিব্যি আছে! কিন্তু ওরা জানে না যে ঘরে এসেই মৃন্ময় বিছানা নেবে। ক্লান্ত শরীরে গভীর ঘুমে তলিয়ে যাবে। আর তাই ছোট আপারা প্রথম দিন আমাদের নিয়ে বিহার ঘুরে যখন দ্বিতীয় দিনও বার্ড-এ ঘুরতে যাওয়ার প্ল্যান করছিলেন সকালবেলাতেই, মৃন্ময় ঘুম থেকে উঠছে দেখে তাড়াতাড়ি শুইয়ে দিলাম, বললাম, ‘এখন উঠো না। উঠলে নীলাচল বাইতে হবে!’ 

আতঙ্কিত হয়ে আবার তড়িঘড়ি করে শুয়ে পড়ল মৃন্ময়। একটা ব্যাপার আমি ঠিক বুঝি না—মানুষ সব বোঝে, বুঝেও কেন অবুঝের মতো কাজ করে! আমার উনিশ হাজার টাকা বেতনের দিনে, আমার সমস্ত বিত্তান্ত জেনেও এক বান্ধবী আমার বাসায় বেড়াতে এসেছিল সপরিবারে। ন-দিন ছিল ওরা। সেই ন-দিনের জন্য আমাকে বারো হাজার টাকা ধার করতে হয়েছিল। সেই ঘটনার পর থেকে সব ধরনের ছুটকা যোগাযোগও বন্ধ করে দিয়েছিলাম। আতিথেয়তার আদিখ্যেতা ও খরচ দুইটাই অসহ্য লাগছিল! কে বলে অর্থ অনর্থের মূল? আমি তো দেখি সমস্ত অসুখের টোটকা একমাত্র অর্থ—সমস্ত সুখের মূল, ভালোবাসা পাওয়ার কেন্দ্র। মৃন্ময়ের ক্ষেত্রে এখন অবশ্য অর্থও ফেল খেয়ে যাচ্ছে। যে-অর্থ হাসিনাবাহিনী গত সতেরো বছর ধরে পাচার করেছে, সেটা দিয়েও তার সমস্ত পিলেট নির্মূল করা সম্ভব নয়। ডাক্তার বলেছিলেন, ‘যেগুলো বেশি যন্ত্রণা করছে সেগুলো মার্ক করতে শুরু করুন। ওর টেস্ট পরীক্ষার পর কিছু বের করা যায় কি না দেখি। আর স্কিন গ্রাফটিং যদি সম্ভব হয় সেটা ওর এসএসসির পর হবে।’ 

হাসপাতালেই অস্থির হয়ে যাচ্ছিল মৃন্ময়; অনেকক্ষণ হেঁটেছিল, দাঁড়িয়েছিল। যত বলি, ‘আমার কোলে মাথা রেখে লম্বা সোফাটায় একটু শুয়ে থাকো উপুড় হয়ে’, ততই ‘লাগবে না, লাগবে না’ করে। এমন তাগড়া দেহের ছেলে কুপোকাত হয়ে শুয়ে আছে—এটা কাউকে দেখাতে লজ্জা হচ্ছিল মনে হয় তার। ওর অবস্থা দেখে বুকের মাঝখানটায় টনটন করে ওঠে। যাত্রীছাউনির পিছনে পড়ে আছে গুলিবিদ্ধ মৃন্ময়। কিছু ছেলে ওকে পানি খাওয়াচ্ছে, অ্যাম্বুল্যান্সে তুলে দিচ্ছে—এমন একটা ভিডিও এই শহরে প্রচার পেয়েছিল তখন, ইন্টারনেট সচল হওয়ার পর। আমি অবশ্য পুরোটা দেখতে পারি নি, ছাত্রছাত্রীদের কাছ থেকে শুনেছিলাম। এখন যারাই শেখ হাসিনার পতনে মৌলবাদের উত্থান হচ্ছে বলে হাসিনার গণহত্যাকে স্বীকৃতি দিতে চায়, ইচ্ছে করে তাদেরকে মৃন্ময়ের ভিডিওটা পাঠিয়ে বলি, ‘আপনার সন্তানকে এভাবে পড়ে থাকতে দেখেও যদি আপনার শেখ হাসিনার প্রতি বিশ্বাস অবিচল থাকে, তাহলে আপনাকে স্যালুট! যদি না থাকে তাহলে এই বেলা হাসিনাবন্দনা বন্ধ করুন, অ্যাট লিস্ট আমার কাছে।’ 

শিক্ষার্থীরা ইউজ্ড হয়েছে কি না জানি না, কেবল এটা জানি, একটা প্রহসনের নির্বাচন, গণতন্ত্র-ধ্বংসকারী ও গণহারে শিক্ষার্থী-হত্যাকারী সরকারের বিলোপ জরুরি। আর মায়ের-কোল-খালি-করা ডাইনিকে আমি কিছুতেই শাসকের ভূমিকায় দেখতে চাই না। যদি তাতে দেশকে আফগানিস্তান হয়ে যাওয়ার রিস্কের মধ্য দিয়েও যেতে হয়, আমি সেই রিস্ক নিতেও প্রস্তুত।


আরাবির দিকে তাকিয়ে মৃন্ময়ের মা মনে মনে বলে, ‘কী ভাগ্য তোমার! বাবা আয় করে, মা করে সেবা!’


৫
দুপুর বারোটার রোদ মাথায় নিয়ে অনিচ্ছা সত্ত্বেও নীলাচল পাহাড়ে এসেছি। এই শহরে যারা আসে তাদের ঘোরাঘুরির জায়গার অভাব পড়ে না। অবশ্য আমার বাসায় খুব কম মানুষই আসতে পেরেছে। প্রথম দিকে অনটন আর পরে মানুষের উপস্থিতিতে অস্বস্তি বোধ করা আমার ইমেজের কারণে কেউ কুমিল্লায় এলেও আমাকে নক করত না। ছোটো আপাদের সাথে দেখা সম্ভবত ন-বছর পর—মৃন্ময়কে দেখতে এসেছেন তারা। ওরা আসবেন শুনেই বিরক্ত হয়েছিলাম। প্রথমত, দীর্ঘ বিরতির আগে আপার সাথে হওয়া শেষ কথোপকথন। দ্বিতীয়ত, যার সূত্রে তাঁদের সাথে সম্পর্ক, সেটাই যখন ছিন্ন তখন আর দেখতে আসার নাটক কেন? ফোনে খবর নিচ্ছিলেন, তাতেই তো বেশ চলছিল। 

আপাদের আগমন উপলক্ষ্যে দীর্ঘদিন পর বারান্দায়-রাখা গাছগুলোর দিকে নজর দিয়েছিলাম। বুয়াকে দিয়ে পুরো বাড়িঘর পরিষ্কার করিয়েছিলাম। আমার প্রাক্তন শ্বশুরবাড়ির সবাই অতিরিক্ত মাত্রায় পরিচ্ছন্ন, আমি তার ধারেকাছেও নেই। আগে যাওবা ছিলাম, আবির চলে যাওয়ার পর সেই দায়ও গেছে, আমি স্বরূপে ফিরে এসেছি। আমার এলোমেলো বইখাতাগুলো এখন কারও বিরক্তিকে আর গ্রাহ্য করে না। অবশ্য আমি আগের মতোই ফিটফাট আছি—এমনটাই মনে হয় ছোটো আপাদের দেখাতে চাইছিলাম, নইলে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার এত হিড়িক ফেলে দিয়েছিলাম কেন!

আপাদের যে-ঘরে থাকতে দেওয়া হয়েছে সেখানে গৌতম বুদ্ধের ছোট্ট একটা ভাস্কর্য ছিল, সাথে ছিল একটা আনুবিস আর তারাদেবী। ‘বুদ্ধ কিছুক্ষণ উল্টোভাবে ধ্যান করুক’ বলে দুলাভাই বুদ্ধকে ঘুরিয়ে দিলেন। ভাগ্যিস বাংলাদেশের অনেকেই আনুবিস আর তারাকে চেনে না, নাহলে তারাও উল্টে যেত! আপারা সপরিবারে হজ করে এসেছেন সম্প্রতি, তার ফজিলত এই। নয়তো মৃন্ময়ের বাবার বাড়িতে আমি সরস্বতীকেও দেখেছিলাম। মৃন্ময়ের দাদা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা নিয়ে পড়াশোনা করেছিলেন। তার ছোট ছেলের কাজকর্মে তিনি চরম বিরক্ত হলেও আমাকে মেনে নিয়েছিলেন সম্ভবত বাংলা কোটায়। কিন্তু ইদানীং এই পরিবারে অনেক পরিবর্তন দেখছি। দশ বছর আগেও এঁরা কেউ মাথায় ঘোমটা দিতেন না, কিন্তু আজকাল সবারই ধর্মেকর্মে বিশেষ মতি এসেছে। আপা-দুলাভাই—দুজনের মুখ থেকে মক্কা-মদিনায় অভিজ্ঞতার কথা শুনছি। তাঁদের ছেলের কিছু শারীরিক জটিলতা আছে, সেগুলো থেকে নিস্কৃতি পাওয়ার আকাঙ্ক্ষাও হজযাত্রার অন্যতম কারণ। মৃন্ময়ের জন্য জমজম ও শেফা কূপের পানি এনেছেন। তিনদিন ধরে মা জ্বরে ভুগছে—গায়ে-গায়ে জ্বর। আগে থেকেই নানান জটিলতায় ভোগার কারণে এই জ্বর বড্ড কাহিল করে দিয়েছে তাকে। পানির বোতলদুটি দিয়ে বললাম, ‘নিজে খেয়ো, মৃন্ময়কেও খাইয়ে দিয়ো। আমার দায়িত্বে থাকলে ভুলে যেতে পারি।’

আপা-দুলাভাই দুজনেই কথা বলতে বেশ পছন্দ করেন। আমি মনোযোগী শ্রোতার ভান করছি, যদিও মাথায় তেমন কিছু ঢুকছে না। গল্প মক্কা-মদিনার সফরশেষে দেশে ঢুকেছে। দুলাভাইয়ের এক ভাগ্নি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, তার কাছে কিছুক্ষণ থাকল গল্পের ডালা। এরপর আপা ছিনিয়ে নিয়ে তাঁর বড় ভাইয়ের মৃত্যুযাত্রায় তুলে দিলেন। এরপর আবার দুলাভাই কেড়ে নিয়ে তাঁদের গ্রামে পাঠিয়ে দিলেন। আপা-দুলাভাইয়ের কাড়াকাড়ির মাঝে চূড়ান্ত বিরক্তি নিয়ে হাই গোপন করছি। কত শত কাজ পড়ে আছে আমার! নজরুল ইউনিভার্সিটি থেকে একটা আর্টিকেল এসেছে অনেকদিন হয়ে গেছে। রবীন্দ্র আর বঙ্গবন্ধু থেকে দুই বান্ডেল খাতা এসেছে, নিজের বিশ্ববিদ্যালয়েরও এক বান্ডেল জমেছে। সব এই ছুটিতেই শেষ করতে হবে, আর আমাকে কি না ঘণ্টার পর ঘণ্টা শুনতে হচ্ছে অচেনা সব মানুষের অপ্রয়োজনীয় সব গল্প। ভূমি অফিসে দুলাভাইয়ের কী না কী জটিল কাজ—এসবের অনুপুঙ্খ জেনে আমার কী লাভ! ছোট আপার প্রতিবেশীর কাহিনিতে আমার কেন আগ্রহ থাকবে? অস্থির মন নিয়ে বিরক্তি চেপে বসে থাকা ছাড়া উপায় নেই। কিন্তু গল্পের মাঝেমধ্যেই বেরসিকের মতো বাম হাত ঢুকিয়ে দেয় আরাবি। চিৎকার করে এমন একটা আহ্লাদি শব্দ করে যে পিলে চমকে যায়। মাথামুণ্ডু বুঝতে পারছিলাম না বাচ্চাটার কাণ্ডকারখানার। বেশ কিছুক্ষণ পর অবশ্য ছেলেটার সাইকোলজি ধরতে পারলাম। আরাবি আসলে মনোযোগ চায়। ওর বাবা-মা কিংবা যাদের বাড়িতে বেড়াতে এসেছে তাদের জানান দেওয়া—তার গ্রহণযোগ্যতা সবার আগে! 

আপা-দুলাভাইও অবশ্য সাথে-সাথে আরাবির বিষয়ে সচেতন হয়ে পড়েন। মৃন্ময় ক্লাস থ্রিতে পড়ার সময় থেকেই স্কুল থেকে ফিরে বাসার তালা খুলে ঘরে ঢুকে ভাত খেত। তরকারি ফ্রিজে তুলে রাখত। সেই মৃন্ময়ের মায়ের সামনে যখন বাচ্চা নিয়ে কেউ মাত্রাতিরিক্ত আহ্লাদ করে, তখন তার কেন জানি মেজাজ খারাপ হয়। সে অবশ্য সিরিয়াস ভঙ্গিতেই আপাদের মতো করেই আরাবির দিকে মনোযোগ দিচ্ছে। শিশুটিও মৃন্ময়ের মতো। বয়স ছয়, কিন্তু পায়ের মাসলে কী একটা সমস্যার কারণে বেশিক্ষণ হাঁটতে পারে না। তার আগে ওর কথা বলাতেও সমস্যা ছিল। আপা সন্তানের চিকিৎসা ও তাকে সময় দেওয়ার জন্য চাকরিও ছেড়ে দিয়েছেন। আরাবির দিকে তাকিয়ে মৃন্ময়ের মা মনে মনে বলে, ‘কী ভাগ্য তোমার! বাবা আয় করে, মা করে সেবা!’

আপার দিকে তাকাই। কী পরম ধৈর্য নিয়ে ছেলেকে সামলাচ্ছেন! মাস ছয় আগে মৃন্ময়ের চাচাতো বোন ফোন করেছিল। ছোট আপার কথা ওঠায় বলেছিল, ‘না, ছোট ফুপ্পির আর বাচ্চাকাচ্চা হয় নি। একটা বাচ্চা দত্তক নিয়েছে তারা।’

দত্তক-বাচ্চাকে এত ভালোবাসা পেতে দেখে আমার অবশ্য রাগ হয় না। এই বাচ্চার স্বত্বাধিকারী আপা-দুলাভাই। বাচ্চার বায়োলজিক্যাল পিতামাতার সাথে তাদের কোনো দ্বন্দ্বও নেই। মৃন্ময়কে তো আমি স্বত্ব ত্যাগ করে দিতেও চাই নি।

কামরুন নাহার শীলা

কামরুন নাহার শীলা

জন্ম ২৯ জুন, ১৯৮১; সোনাগাজী, ফেনী। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায়...বিস্তারিত