চরিত্র
ভাই • বোন
: কী করবা ভাই?
: কিছুই করব না।
: তাই বলে আব্বার চল্লিশা করবা না!
: তুই কি কানা? ঠসা? কানে শুনিস না, চোখে দেখিস না! এখন এইসব চল্লিশা-ফল্লিশা কইরা কী হবে? আসবে কেউ? খামাখা টাকা নষ্ট?
: তুমি পয়সা খরচের চিন্তা করতেছ! আব্বা যা রাইখা গেছে তা কি আমরা খরচ কইরা শেষ করতে পারব! আর তুমিই কি খরচের কথা ভাবতেছ!
: আরে, খরচের উপায় কী! দুনিয়ার সব কিছু বন্ধ। চারিদিকে সব বন্ধ। একটা ফকিরও তো নাই! কারে খাওয়াবো, কী আয়োজন করব! আর আব্বা এত এত টাকা কামাই কইরা কী করতে পারল! সে তো কোনোদিন এই দেশে চেকআপও করায় নাই! একটা কাশি দিলেও ব্যাঙ্ককে চলে যাইত। সেই আব্বা কিনা মরলো প্রায় বিনা চিকিৎসায়!
: শুধু কি মরল! ঠিকঠাক কবরও দিতে পারলা না ভাই।
: সবই পাপ! আল্লাহর গজব।
: ছি! তুমিও অশিক্ষিতের মতো এইসব কও? পাপ-পুণ্যের হিসাব কি দুনিয়ায় হয়? আল্লাহর গজবই হয় কেমনে! আব্বা নিজে মসজিদ বানাইছে দুইটা আর টাকা দিসে কত মসজিদে তার কোনো হিসাব আছে! তার সবগুলো ফ্যাক্টরিতে মসজিদ আছে। আব্বার বানানো স্কুল, কলেজই কও, আর লঞ্চই কও, সবখানে আগে নামাজের জায়গা ঠিক হইছে, পরে অন্য কথা। তোমার শরম করল না আব্বার সম্পর্কে এমন কথা কইতে!
: এখন তো লাজ-শরমের দিন না বইন। ঘোর কেয়ামতের অবস্থা। এখন যে যার প্রাণ বাঁচানোতেই ব্যস্ত। ইয়া নফসি, ইয়া নফসি। চাচা আপন পরান বাঁচা। দেখলি না, একটা চাচাও আসে নাই আব্বার জানাযায়।
: সম্পত্তির ভাগ-বাটোয়ারায় ঠিকই আসব।
: হ, তখন সোস্যাল ডিসটেন্সও থাকব না, লকডাউনও থাকব না।
: আমরা থাকি কি না দেখ!
: ভাই!
: ভাই, ভাই করিস না! ন্যাকামি ভাল্লাগে না। আল্লাহর গজবই কস আর পাপের ফলই কস আদতে সবই হইলো প্রকৃতির প্রতিশোধ, লোভের ফলাফল। মিথ্যাচার, অন্যায়ে ভরে গেছে দুনিয়া। আব্বা তো দুনিয়ার বাইরের কেউ না।
: তাই বলে আব্বার মতো ভালো মানুষ এমন বিনা চিকিৎসায় মরে গেল! লক্ষ লোক আসার কথা তার জানাযায়। অথচ দেখো, অচেনা কয়েকটা মানুষ পিপিই পরে আব্বারে কবরে নামিয়ে দিল! কোনো রকম মাটি চাপা দিল! আমরা কেবল দূর থেকে দেখলাম। আমরা কিছুই করতে পারলাম না!
: দেখ, মৃতের সম্মান আছে। মৃত মানুষকে সম্মান দেখানোর নিয়ম। তাই বইলা সম্মান দেখাতে গিয়ে মিথ্যাচার করা যায় না। আব্বা আমাদের জন্মদাতা, জনক। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সে ছিল সফল মানুষ। স্কুল, কলেজ, কলকারখানা কী করে নাই সে। কিন্তু আর যাই বলি, তারে ভালো মানুষ বলা বড় মুশকিল। সফল মানুষ আর ভালো মানুষ তো এক না। আর ভালো মানুষ আর যাই করে টাকার পেছনে ছোটে না।
: ভাই, তুমি বুঝি খুব ভালো মানুষ!
: চেষ্টা তো করি, ইচ্ছাটা তো আছে!
: সে তো দেখতেছিই। রাগ কইরো না ভাই, সত্য কথাটা হইলো, তুমি একটা ভণ্ড। ভান করতে জানো খালি। তুমি জানো তোমার নামে ব্যাঙ্কে কোটি কোটি টাকা আছে, তোমার বিদেশি পাসপোর্ট আছে, তুমি এখনও দাঁড়ায়া আছ আব্বার বাড়িতে। তোমার নিজের কী পরিচয়? তুমি অমুক কোম্পানির সিইও, তমুক কোম্পানির ম্যানেজিং ডাইরেক্টর, সবই তো আব্বার কারণে! এতই যদি ভালো মানুষ হও, ফেলে দাও আব্বার দেয়া পরিচয়! অস্বীকার করো তার দেয়া সম্পদ।
: খুব রেগে গেছিস! ঠান্ডা মাথায় ভেবে দেখ, কী হলো বিদেশের পাসপোর্ট দিয়ে! নিয়ে তো যেতে পারলাম না আব্বাকে কোনো দেশে? সারা জীবন আমরা ভেবে এসেছি, টাকা হলেই সব পাওয়া যায়। কিন্তু পেলাম না তো সব। আর দশটা সাধারণ লোকের পাশেই কোটি কোটি টাকার মালিককে মরতে হলো সাধারণ চিকিৎসা নিয়েই। জানিস, আব্বা চাইত, দেশের সবচেয়ে দামি হাসপাতালটা বানাতে। রয়েল এডিলেটের মতো একটা হাসপাতাল করতে চেয়েছিল বাংলাদেশে। বলেছিল, বিদেশে যাবে না লোকে, তারা এ হাসপাতালে চিকিৎসা করাবে। এটা ছিল আব্বার শেষ প্রোজেক্ট। বেঁচে থাকলে করতেন।
: অথচ সেই মানুষটাই মরল দেশের সাধারণ একটা হাসপাতালে অতি সাধারণভাবে! অক্সিজেনের অভাব, লাইফ-সাপোর্ট দুর্বল। এ দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা যা তা! সরকার তো তাও চিকিৎসা দিছে, প্রাইভেট হাসপাতালগুলা তো রোগীই নেয় নাই। একটু জ্বর শুনলেই তাদের মাথায় জ্বর ওঠে।
: এইটা তো বলতে চাচ্ছি তোকে। আব্বা যদি তার স্বপ্নের হাসপাতালটা বানাত তাহলে সেখানেও কি কোনো সাধারণ মানুষ চিকিৎসা পেত! এই মহামারিকালে দাঁড়াত সাধারণ মানুষের পাশে? এ দেশের তথাকথিত কোনো নামকরা হাসপাতালে কি সাধারণ লোকে চিকিৎসা পায়! আমরা টাকা কামানোর জন্য হাসপাতাল বানাই। প্রাইভেট হাসপাতালগুলো মানে পাঁচতারকা হোটেল। হেলিকপ্টারে করে রোগী আসবে। কিন্তু তারা কোনো সাধারণ রোগী নয়। ভিআইপি, সিআইপি। আমরা কী? আমরা সিআইপি। আমাদের বডি গার্ড আছে। বিদেশ ছাড়া আমাদের চলেই না। দেশে টাকা কামাই বিদেশে খরচ করি! এখন? চাইলেও আব্বার চল্লিশা করে দশটা ফকির খাওয়াতে পারব না। একবার ভাবছিস, ফুটপাথে যারা ঘুমায়, লঞ্চঘাটে, রেলস্টেশনে যারা ঘুমায়, বস্তিতে যারা থাকে, তাদের স্বাস্থ্য-সচেতনা কী? তাদের জন্যে কিছু করা তো দূরের কথা, আমরা তাদের কথা ভাবিও না। আমরা নিজেদের ড্রাইভারকে বেতন দেই না, কাজের লোক কমিয়ে দিয়েছি, বাড়ির ছুটা বুয়ারা আর আসে না, দারোয়ার দুইজন থেকে একজন করেছি। আমরা কি ভেবেছি, ওরা কী খাবে? দুচারটা ছবি তুলে কিছু সাহায্য আমরা করেছি। যতটুকু করেছি তারচেয়ে বেশি প্রেস কাভারেজ নিয়েছি। আর আমরা খুব ভালো, তাই না রে?
: খোঁচা মাইরো না ভাই। তুমিও এই সিস্টেমের বাইরে না। করোনার শুরুতেই গার্মেন্টস নিয়া যে খেলা হইলো তুমি তার খেলোয়াড় ছিলা না?
: ছিলাম। শোন, আমি চে গুয়াভারা না, লেলিন না, আমি বঙ্গবন্ধুও না। ধুর, খামাখাই উনাদের নাম নিলাম। আমি তো উনাদের কারো নখের ময়লা হওয়ারও যোগ্য না। আমারে দিয়া বিপ্লব হবে না। কথা ঠিক, আমি সিস্টেমের ভেতরের মানুষ। এই যে এমএম গ্রুপ অব ইণ্ডাস্ট্রিজ, আমরা তিন ভাইবোন জন্ম থেকেই এর মালিকানার অংশীদার। কিন্তু আমাদের নিজেদেরও কোনো ক্ষমতা নাই এইসব প্রতিষ্ঠানের একটা আইন-কানুন বদলে দেয়ার। মন্ত্রীকে খুশি রাখতে হয়, পুলিশকে খুশি রাখতে হয়, রাজনীতিবিদকে খুশি রাখতে হয়। এত লোকরে খুশি রাখতে ব্যস্ত থাকলে আমরা জনগণকে খুশি রাখব কখন! আমরাও চলি, অলিখিত আইনে। সেইসব আইন চোখে দেয়া যায় না, কিন্তু মানতে বাধ্য আমরা। তুই আমি চাইলেও কর্মীদের ইচ্ছামতো বেতন, বোনাস বাড়াতে পারব না। বাকি প্রতিষ্ঠান তখন আমাদের বিরুদ্ধে লাগবে। প্রশাসন থেকে প্রশ্ন আসবে? আমরা নিজেদের ঘাড়ে কোনো দায়িত্ব নেই না। কর্মীর ঘাড় ভেঙে খাই, ‘সম্মানিত গ্রাহক’, ‘কাস্টমারই সব’ এইসব বাক্য বলে সাধারণ লোককে ঠকিয়ে ব্যবসা করি। আদতে একটা প্রতিষ্ঠানের আড়ালে হাজার হাজার কর্মীর ঘাম আর রক্ত থাকে। কিন্তু তার চেয়ে বড় সত্য কথাটি হলো, মানুষকে না-ঠকিয়ে হাজার কোটি টাকার মালিক হওয়া যায় না।
: তোমার কি মনে হয় না ভাই, আব্বা এ সব জানতেন? তাই দান খয়রাত করেছেন দু’হাতে। অসংখ্য মসজিদে, মাদ্রাসায় আব্বার দানই ছিল সবচেয়ে বেশি।
: কিন্তু আব্বা চাইলেই পারতেন একটা বিশাল হাসপাতাল বানাতে। ভিআইপিদের জন্য নয়, দেশের সাধারণ মানুষের জন্য হাসপাতাল। অন্তত আমাদের কর্মীরা সেখানে সেরা চিকিৎসা পেত কম খরচে।
: তুমি তো করতে পারো ভাই। যদি পাপই হয়ে থাকে, তবে প্রায়শ্চিত্ত করা যায়। আমরা যেমন আব্বার পিতৃপরিচয় মুছতে পারবো না, তেমন তার পাপ-পুণ্যের দায়ও তো এড়াতে পারব না।
: না, পারি না। তোর আমার আপন ভাই-ই বাধা দেবে। সে প্রথম বাক্যই কী বলবে জানিস...
: প্রোজেক্ট প্রোপোজাল রেডি করো, প্রফিট মার্জিন কত তা দেখাও...
: এই তো একদম ঠিক কথাটা বলেছিস!
: আমিও তো ব্যবসায়ীর রক্ত ধারণ করি।
: ব্যবসা! এই ব্যবসায়ই দুনিয়াটা খেলো। নদী ধ্বংস করলাম আমরা, জঙ্গল ধ্বংস করলাম, সমুদ্র বিনাশ করলাম, এমনকি মহাশূন্যেও আমরা ব্যবসা ফেঁদে বসেছি।
: ভাই, ইসলাম কিন্তু ব্যবসাকে হালাল করেছে, সুদকে হারাম করেছে। আমার নবীজি তো ব্যবসায়ী ছিল?
: হা, হা, হা। হাসালি তুই আমারে! সেই নবীজির আমলের ব্যবসা কি আমরা করি? ব্যবসা কি আমাদের পেশা! এ যে নেশা! ড্রাগের চেয়েও লাভের নেশাটা বড় রে। লাভের লোভে আমরা সব খেয়ে ফেলতে চাই। ও কি, কী হলো তোর!
: হঠাৎ মনে হলো পায়ের তলার মাটিটা কাঁপছে, মাথাটা কেমন চক্কর দিচ্ছে।
: জ্বর-টর? দেখ, কিছু লুকাসনে। আমরা তো আব্বার করোনাকে লুকিয়েছি। লাভ কি হয়েছে?
: ভাই, আমারও জ্বর জ্বর লাগছে। বুকের মধ্যে একটা চাপ!
: ভয় পাবি না। আমি ডাক্তার মামুনকে খবর দিচ্ছি।
: ভাই, আমি একটা রিকোয়েস্ট করি তোমাকে?
: কর।
: তুমি একটা হাসপাতাল করো। আব্বার নামে। সাধারণ মানুষের জন্য অসাধারণ একটা হাসপাতাল করো। প্রয়োজনে মাননীয় প্রধান মন্ত্রীর প্রণোদনা...
: আবার তোর ব্যবসায়ী রক্ত কথা বলে উঠছে। প্রণোদনার ধান্দা বাদ দে, আগে নিজে বাঁচার চিন্তা কর। তুই বোস এখানটায়। না, বরং শুয়ে থাক। আমি ডাক্তার মামুনকে আসতে বলি। ভয় পাসনে। যা হবে, আমরা সামাল নিব। আব্বার জন্য আমরা কিছু করতে পারি নি। কিন্তু তোকে হারাব না আমি। তোকে আমার লাগবে। আমি একা কিছু করতে পারব না।
: আমি আছি ভাই। গজব, পাপ-পুণ্য সব কিছুতেই আমি আছি, তোমার সাথে। আমাকে শুধু মরতে দিয়ো না!
: মানুষ তো মরবেই। মানুষ অমর না রে! তবে তোকে এখনই মরতে দিব না আমি। কিছু মানুষকে প্রয়োজনের চেয়ে একটু বেশি হলেও বাঁচিয়ে রাখব। বুঝলি?
: জ্বি ভাই।
: বেশ। তবে উপুড় হয়ে এইখানটায় শুয়ে থাক। এটাকে বলে প্রনর পজিশন। হুম। এইভাবে উপুড় হয়ে থাকলে ফুসফুস বেশি বাতাস নিতে পারে। হুম। জোরে জোরে শ্বাস নে। প্রাণ ভরে শ্বাস নে। আমি আসছি। ডাক্তার মামুনকে খবর দিয়ে আসি।