পরমগীত

মোস্তফা হামেদী-কে

ভালোবাসার পুরুষটিকে নারীর কথা

হরিণের তন্দ্রা এল করে বাতাসে পাতার আওয়াজ ভাঙে তারাদের ঘুমন্ত সব আলো ঝিকিমিক করছে ঢেউয়ের গাঙে

কেটলিতে বাষ্প পুড়ে যায় বনতল পত্রঝরা দূরে ভেড়াদের খুরের ঘায়ে ঘায়ে বাজল কি গোধূলি সন্তুরে—!

ম ম ঘ্রাণ তিসির খেতে হাওয়া মৌমাছি বসছে ফুলের টোলে নদীতে গোসল করো তুমি শরীরে মদের বাতাস দোলে

আমাকে তিলের ফসল করো তোমার ওই আঙুরবনের হেমে পাতাময় দুপুর রোদের ছায়ায় কে যেন ঘুমিয়ে গেছে প্রেমে

 

পুরুষটির প্রতি নিঃসঙ্গ রমণীগণ

তর্জমার মতন করে ফুল এ মাঠে ফুটতেছে কোন হাওয়ায় নিরর্থে সুরভিত রোদে পারাবত একলা উড়ে যায়

তোমাকে বলতে গিয়ে কথা আমাদের দিন থেমে যায় মেঘে আমাদের কেমন করে মন হারানো ছাতার সাথে জেগে

 

রমণীগণের সঙ্গে নারী কথা বলল

আমাকে বাসতে ভালো চেয়েছে গাঙের হাওয়া সেখানে বয়স আমার পূরবীর সুরে গাওয়া

মালহারে রোদ নেমেছে পুদিনার মতন সে ঘ্রাণ খরগোশও ঘাড় বাঁকিয়ে দেখতেছে চাঁদনিতে স্নান

আমি তার সান্দ্র চোখে মহুয়ার শীতার্ততা সরোদের গভীর কাঠে বেজে যায় নীরবতা

 

পুরুষের প্রতি নারীর কথা

কিভাবে চুমুর ছায়ায় দুপুরে মেঘের পাশে ধুন্দুলে বাতাস লেগে ঘুমালে মাঠের ঘাসে—

তোমাকে খুঁজতে গিয়ে সোনালু ফুলের বনে হেমন্তে ধূসরতায় পতঝর উন্মীলনে

পেয়েছি—বৃষ্টি পড়ে হুইসেলে রেলবাঁশিতে আঙুলে রাত্রি ধরে ছুঁয়ে যাও বোঁটার শীতে

স্তনেও মেঘ করেছে বাদামি মদের শিশির চেটে নাও মঞ্জরিতে আশরীর শস্য—কৃষির

জমিতে ঘাসের ফুলে ফুটেছে খনার শোলোক আঙুরের মন্দ্র খেতে আমাদের বিবাহ হোক—

 

নারীর প্রতি পুরুষের কথা

দয়িতা, চোখে রেখে দাও নিসর্গে আস্তে করে পাতাদের ঝরার আওয়াজ এ বনে ঘুমিয়ে পড়ে

কে তাদের মধ্যঘুমে ঝরাল বৃষ্টিতৃণ যে গানে টোল পড়েছে তুমি তার চোখ জুড়ানো

মোহিনী ঢেউ—এ গাঙে কুমারীর দুধের মতো কোমল এক বাতাস এসে ভিজে যায় ইতস্তত

 

নারীর কথা

ডালিমের রসের মতো বিকাল পেরিয়ে যাচ্ছে কারা ধু ধু মেশিনে নামছে দূরে রাত ভাষা কি অর্থে ভরা শুধু?

তোমাকে বিষণ্নতায় ভাবি এ মনে—অন্ধ নদীর কূলে বৃষ্টিতে ভেজে নৌকাগুলো শিশুদের হাইয়ের মতন দুলে

ভাঁটফুল রিনরিনে দূর হাওয়ায় হেমন্তে মাঠের পাশে আলো এ জীবন কৃষ্ণচূড়ার রং তুমি তার ছায়ায় টলোমলো

 

পুরুষের কথা

দুচোখে ভ্রাম্যময়ী হাওয়া পারাবত, নীল পারাবত, ওড়ো তোমার ওই তাকিয়ে থাকাও যেন ঘুমন্ত হরিণ জড়সড়

 

নারীর প্রতি পুরুষের কথা

গাঙে কার উঠেছে ঢেউ পূরবী রঙের সে চোখ আঙুরে ফলেছে রোদ টোলে কি ফুটল অশোক—?

সে কি আজ ভাষার মতন ভেতরে অর্থ রেখে হাওড়ে ধানের বাতাস সারা মাঠ যাচ্ছে পেকে—

নাভিতে তিলের পাশে অলক্ষ্যে নেমেছে শীত যেন কোন সরোদ বেয়ে নীরবে বাজছে শিশির তুমি কার হাঁসের বনে হেঁটে যাও হিমসকালে শিমুলের ফুটতেছে ফুল মনে হয় শিস বাজালে

শাড়িটা কাঁপছে মনে যেভাবে গাঙের ঢেউয়ে ডাহুকী দুলতে থাকে সে জলে অপার হয়ে

তোমাকে দেখেছি সেই প্রাচীন এক দূর শহরে সামান্য ক্যালেন্ডারে বারোমাস বৃষ্টি পড়ে

কামিনী অন্ধকারে যামিনী পার হয়ে যায় মেশিনে টারবাইনে ঘূর্ণনে রাত্রি নামায়

শীৎকারে কেঁদে ওঠো কী পরম এলানো মুখ ভায়োলিন ভেঙে যেন অজস্র উড়ছে ডাহুক

 

পুরুষের প্রতি নারীর সম্ভাষণ

পারাপার যেই সাঁকোতে ভেঙেছে, হয় নি বলা আমাকে দেখতে এসো আমি যে রজঃস্বলা

হাওয়াতে নৌকা দোলে সহসা ছলাৎ বাজে মনে হয় গাঙের হাওয়া তোলে সুর পাখোয়াজে

যে আমার ডালিম ফলে দেখেছে বিত্রস্ত মৌ আমি তার শিমুল-আকাশ মমতায় কুমারী বউ

 

নারীর প্রতি পুরুষের কথা

লেবুফুল সন্ধ্যাতারায় নিরলে ছড়াচ্ছে ঘ্রাণ তোমাদের বাড়ি দূরে ভরা মাঠ কুয়াশাম্লান

ভাঙা ব্রিজ, কালভার্টে দুপুরের রৌদ্র পড়ে বোরখায় ঢাকা তুমি এস্রাজে বৃষ্টি ঝরে

তুমি কি সলোমনের সুগন্ধি প্রেমের সে গীত অথবা প্রাচীন দেশে ওক গাছে তুষারে শীত?

 

পুরুষের প্রতি নারীর কথা

আমাকে দেখতে এসো ভালো যে লাগে না আর বাটিতে দুধের সরে পড়েছে রোদ কবেকার

দূরে কোন হাওয়ার ব্রত এখানে বৃষ্টি ঝরায় বাতাবি লেবুর ফুলে সুরভি খোঁপা পরায়

পুকুরে কৃষ্ণচূড়ার কী গভীর ছায়া পড়ে হাওয়াতে পাতা কাঁপে সমস্ত জীবন ধরে

 

নারীর প্রতি পুরুষের কথা

তুমি কি মেয়ে ভালো, হাওয়া—! চোখের দূর থেকে ভোরে কে যেন শুরে নেয় স্মৃতি সকালে মার মতো করে—

এখানে অসুখের দিন—! ভেড়ারা ধুন্দুলমাঠে হারানো তাকিয়ায় শুয়ে কী যেন ভেবে দিন কাটে

একাকী দুপুরের রোদে, বাতাসে ভাসে কার ঘ্রাণ স মিলে ব্লেড ঘুরে ঘুরে ক্লান্ত থামে সুনসান—

তুমি কি মেয়ে ভালো, হাওয়া—! মেদুর ডাহুকীর চোখ ফসল নুয়ে পড়া সুরে বিবাহ, আমাদের হোক—


* 'সলোমনের পরমগীত'-এর অনুপ্রেরণায়

হাসান রোবায়েত

হাসান রোবায়েত

জন্ম ১৯ আগস্ট, ১৯৮৯; বগুড়া। শিক্ষা : পুলিশ লাইন্স হাইস্কুল, বগুড়া। সরকারী...বিস্তারিত