আমার একলা পথের সাথি : ৪৬

                                                                           পর্ব-৪৫

 পর্ব-৪৬

একেবারে টগবগে তারুণ্যের প্রথম ধাপেই আমি ট্যাবু ভাঙতে শিখেছিলাম আনোয়ারা সৈয়দ হকের উপন্যাস তৃষিতা পড়ে। আমার তখন ষোলো, ওই ষোলোতে ওইরকম একটা বই হাতে পাওয়াটাও সৌভাগ্যের ব্যাপারই ছিল। আর আমাকে বইটা উপহার দিয়েছিল আমার প্রথম প্রেমিক [বর্তমানে পার্টনার! এখানে এক চোখ উইংক করে, জিভ বের করা ইমো হবে। তৃষিতা ছিল একটা দ্বান্দ্বিক প্রেমের উপন্যাস। গৎবাঁধা পুতুপুতু প্রেমের প্যানপ্যানে উপন্যাস ওটা কিছুতেই নয়। ওই উপন্যাস আমাকে যারপরনাই মোহাবিষ্ট করে তুলেছিল।


প্রেম একবার নীরবে এলেও বহুবারই সরবে আসতে পারে।


আনোয়ারা আপাই আমাকে শিখিয়েছিলেন—মানুষ জন্তু নয় বলে বার বারই সে প্রেমে পড়ে! পড়বে!

এবং কারো পূর্ব-প্রণয়কে এত প্রাধান্য দেয়ার কিছু নেই! প্রেম একবার নীরবে এলেও বহুবারই সরবে আসতে পারে।

সনাতনী ধ্যান-ধারণা থেকে মুক্ত হয়ে এক অমল-কিশোরী নরনারীর প্রেমকে অন্য চোখে দেখতে শিখেছিল। [বলে রাখা ভালো যে, আমার প্রথম প্রেমিকের একাধিক প্রেমিকা থাকার সংবাদ শ্রবণ হেতু আনোয়ারা সৈয়দ হকের এই উপন্যাসের সারকথা আমার ক্রোধকে প্রশমিত করেছিল। এবং সে-প্রশমন কোনো হেঁজিপেঁজি প্রশমন ছিল না। ছিল একেবারে দোজখের আগুনে জ্বলন্ত দাউদাউ ক্রোধ থেকে প্রশমন!

নিজের ‘ভুলপ্রেমের’ শুরুতে, মল্লিকাবনে প্রথম কলি ধরার প্রাক্কালে প্রেম সম্পর্কিত আধুনিকতার পাঠ নিয়েছিলাম যে লেখকের লেখা থেকে, সেই লেখকের প্রতি আমার শ্রদ্ধা-ভালোবাসাও ছিল নিখাদ। ফলত আনোয়ারা আপার সান্নিধ্য আমার কাছে চিরকালই পুজোর-প্রসাদের মতো পবিত্র ও শিরোধার্য মনে হয়েছে। আনোয়ারা আপার শিশুর মতো সরল-মন ও অকপটে সত্য কথা বলার স্বভাব আমাকে মুগ্ধ করে রেখেছে তাঁর সাথে পরিচয়ের প্রথম দিন থেকেই।

স্ট্রেইটকাট-স্বভাবের মানুষকে আমি অধিক প্রায়োরিটি দিয়েছি আমার বুঝজ্ঞান হবার বয়স থেকেই। তাছাড়া আমি নিজেও অকপট থাকতেই পছন্দ করি। এবং যাকে যা বলার তা সরাসরিই বলে দিতে চাই। এত ছোট একটা জীবনে কী দরকার এত প্যাঁচগোচ করার?

আনোয়ারা আপার লেখাপত্র হাতের কাছে যা পেয়েছি, পড়ার চেষ্টা করেছি। কিন্তু আমাদের এই পোড়ার দেশে, আনোয়ারা আপাকে একজন আন্ডাররেটেড-রাইটার মনে হয় আমার। আনোয়ারা আপার মতো অত্যন্ত আধুনিক-চিন্তা-মনস্ক একজন স্মার্ট-লেখকের আরও অধিক পাঠকের কাছে পৌঁছানোর প্রয়োজন ছিল। হয়তো একজন কবিকে, একজন সব্যসাচী লেখককে আগলে রাখতে রাখতেই আপা নিজেকে নিয়ে ভাবার বা নিজের কাজের অবকাশ তেমন পান নি। এই পৃথিবীর এটাই তো নিয়ম, যে অন্যের মঙ্গলাকাঙ্ক্ষায় সমর্পিত থাকে, তাঁর নিজের দিকে তাকানোর ফুরসত খুব কমই মেলে।

সেবার লক্ষ্ণৌতে সার্ক লিটফেস্টের দিনগুলিতে আনোয়ারা আপার নিবিড় সান্নিধ্যও আমাকে ঋদ্ধ করেছিল। অত্যন্ত নিকটে থেকে আনোয়ারা আপাকে দেখার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল সে-সময়টাতেই।

আপার কাছে কতভাবেই না লেখার অনুপ্রেরণা আমি পেয়েছি। আনোয়ারা আপা আয়নার বন্দী নামক একটা উপন্যাস এই অধমকে ডেডিকেট করেছেন। আপার উদারতার কাছে নিজেকে কখনো কখনো অতি ক্ষুদ-তুচ্ছ মনে হয়। আমার নিজের লেখা সেরা বইটি [বইটি লিখতে এত বিলম্ব হলো! এই প্রিয় যুগলকে ডেডিকেট করার কথা ভাবতে না ভাবতেই হক ভাই চলে গেলেন লোকান্তরে। আমিও যেন অনেকটাই হতবিহ্বল হয়ে পড়লাম!

হক ভাইয়ের সাথে কাটানো সময়ে আমার যত স্মৃতির-পুষ্প প্রস্ফুটিত হয়েছে, আনোয়ারা আপার সাথে সেরকম পুষ্প  প্রস্ফুটনের সংখ্যা তার চাইতে দ্বিগুণ বা তিনগুণ তো হবেই।

কালি ও কলমের বিশেষ ‘গল্প’ সংখ্যায় আমার ‘সংহরণ সিরিজের’ প্রথম গল্পটি প্রকাশিত হলে সেদিন ভোর-ভোর আমি যার আশীর্বাদে ধন্য হয়েছিলাম, তিনি আনোয়ারা সৈয়দ হক। আমার ‘কুমুদ ও ঢেউয়ের সংহরণ‘ গল্পটি পাঠান্তে আপা আমাকে ফোন করে বলেছিলেন—

পাপড়ি, এ সময়ের অত্যন্ত ভালো লেখক তুমি। তুমি অনেকের চাইতেই অনেক অনেক ভালো গল্প লিখো!

আমি ফোনের এ প্রান্তে হতবিহ্বল হয়ে বসে রইলাম। এ জীবনের ঢের-অপ্রাপ্তি, অপমান আর বেদনার অনন্ত-তিমির বুঝি-বা আনোয়ারা আপার এই একটি বাক্যেই ধূলিসাৎ হয়ে যেতে পারে! সত্যিই তাই, এরকম করে কথা বলার মানুষ আমাদের এই সংকীর্ণ-সমাজে কমই আছে! আপা আমাকে অত্যন্ত স্নেহ করেন বলেই হয়তো ওরকম করে বলে থাকেন।


আনোয়ারা সৈয়দ হকের সাহিত্যকর্ম শুধু গল্প-উপন্যাসের নির্ধারিত-আইল ধরেই হেঁটে গিয়েছে, এমন নয়। সাহিত্যের প্রায় সব-শাখায় আনোয়ারা সৈয়দ হকের অবাধ বিচরণ।


কিন্তু আপার দেয়া ইন্সপিরেশনের বিষয়টি ওই এক গল্পেই থেমে গেল, তেমন কিন্তু নয়। বছর দুয়েক পূর্বে একুশে বইমেলায় [২০১৯ বেঙ্গল পাবলিকেশন থেকে পাবলিশড হলো আমার চতুর্থ উপন্যাস নদীধারা আবাসিক এলাকা। আপা যথারীতি ফোন করে বললেন—

পাপড়ি, তোমার এবারের বইটা নাকি অত্যন্ত ভালো হয়েছে?

আমি বিনীতভাবে জানতে চাইলাম—

কে বলল, আপা?

অনেকেই বলাবলি করছে। আমি আজ মেলায় যাচ্ছি তোমার বইটা কেনার জন্য।

এবারও আমি স্তব্ধ হয়ে বসে রইলাম। কী বলব আমি এই কথার প্রতিউত্তরে? কিভাবে বা কী বাক্যে আমি শুধিব এই ঋণ?

আমার ধারণা, শুধু আমি একাই নই, যে বা যারাই আপার স্নেহছায়ায় নিজেদের জড়াতে পেরেছেন, তারা প্রায় সকলেই আমার মতো অভিজ্ঞতার মাঝ দিয়েই গিয়েছেন হয়তো।

আনোয়ারা আপার প্রায় প্রতিটা প্রকাশিত বই আমার পছন্দের বই হিসেবে বুকসেলফে আলাদা কর্নারে স্থান করে নিয়েছে। রাশিয়ার গিটার্সবার্গে জন্মানো ঊনবিংশ শতকের লেখক ‘ল্যু সালোমের’ জীবন ও কর্ম নিয়ে আপা অত্যন্ত ভালো একটি বই লিখেছেন। বইটির নাম ‘ল্যু সালোমে, সাহিত্যভুবনের অগ্নিশিখা’। এই বইটির কথা আমি আমার পরিচিত প্রায় সব নারীলেখককে বলেছি। এখনো আমি মনে করি, লিখতে চাওয়া বা না-চাওয়া, নিজেকে জানা বা আবিষ্কারের জন্যও প্রতিটা নারীর জন্য এটি একটি প্রয়োজনীয় বই। অতীব দরকারি-গ্রন্থ।

আনোয়ারা সৈয়দ হকের সাহিত্যকর্ম শুধু গল্প-উপন্যাসের নির্ধারিত-আইল ধরেই হেঁটে গিয়েছে, এমন নয়। সাহিত্যের প্রায় সব-শাখায় আনোয়ারা সৈয়দ হকের অবাধ বিচরণ। এ প্রসঙ্গে উনার আরও একটি বইয়ের কথা না-বললেই নয়। আনোয়ারা সৈয়দ হকের ইতালি ও ফ্রান্স ভ্রমণের অসামান্য অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ ভ্রমণগ্রন্থ যোজন দূরের স্বজনেরা। বইটি পড়ে আমি প্রায় সাথে সাথেই আলোচনা লিখতে বসে গিয়েছিলাম। না-লিখে কিছুতেই যেন আমার স্বস্তি হচ্ছিল না। লেখা শেষ করে পাঠিয়ে দিয়েছিলাম বাংলা একাডেমির পত্রিকা ‘উত্তরাধিকারের’ দপ্তরে।  পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক কবি সরকার আমিন। [সরকার আমিন ও শাহনাজ মুন্নী—এই যুগলকে আমি সবিশেষ পছন্দ করি। এঁদের নিয়ে পরবর্তী কোনো জার্নালে বিশেষভাবে বিস্তারিত লেখার সদিচ্ছা রইল। এই দুই জনকে নিয়ে না লিখলে যে নিজেরই বিরাট অধর্ম হবে।

সরকার আমিন তখন নারীলেখকদের নিয়ে ‘উত্তরাধিকারে’ স্পেশাল আয়োজনে ব্যস্ত। ওই সংখ্যার জন্য ইতোমধ্যে আমিও আমিনকে একটা গল্প পাঠিয়ে দিয়েছি।

এবং আনোয়ারা আপার বইটির আলোচনা লেখা শেষ হয়েছে বলে সেটাও পাঠিয়ে দিয়েছি। আমি জানি, আপাদমস্তক ভালো মানুষ কবি সরকার আমিন আমার লেখার যথাযোগ্য মর্যাদা দিয়ে দুটো লেখাই ছেপে দেবেন এবং তা তাঁর সুবিধা মতো সময়ে।

এমত যখন ভাবছিলাম তখনই আমি না-চাইলেও একটা অপ্রিয়-ঘটনা ঘটে গেল। [যা মনে হলে আজও আমি লজ্জায় অবনত হয়ে থাকি! সংগঠন ‘গাঁথার’ বর্ষপূর্তিতে ঢাকা ক্লাবের সিনহা লাউঞ্জে ডিনারে এলেন বাংলা একাডেমির ডিজি শামসুজ্জামান খান। এলেন সৈয়দ শামসুল হক ও আনোয়ারা সৈয়দ হক। আমি আনোয়ারা আপার যোজন দূরের স্বজনেরা বইটি নিয়ে এতটাই আবেগাক্রান্ত ছিলাম যে, স্থানকালপাত্র ভুলে বইটির বিষয়-আশয় নিয়ে খই-ফোটাতে শুরু করলাম। এবং দিব্যি বিস্মৃত হলাম জামান ভাই আর হক ভাইয়ের মতো বিজ্ঞ-ব্যক্তিদের উপস্থিতির কথা। পরে খেয়াল হওয়াতে থেমেও গেলাম অবশ্য। কিন্তু ইতোমধ্যে বিপদ যা হবার হয়ে গিয়েছে। জামান ভাই জেনে গিয়েছেন বইটি নিয়ে আমি একটা লেখা ‘উত্তরাধিকারের’ দপ্তরে পাঠিয়ে দিয়েছি। এবং বিষয়টি একেবারেই বুমেরাং হলো আমার জন্য তখন, যখন জামান ভাই আমার পাঠানো গল্পটি ছাপা বন্ধ রেখে আনোয়ারা আপার বইয়ের আলোচনাটি ছাপতে বললেন আমিনকে। সরকার আমিনের ‘স্পেশাল ইস্যুটির’ এতে সৌন্দর্যহানি ঘটেছিল অবশ্যই। আর আমিনও আমার উপর হয়তো প্রচণ্ড বিরক্ত হয়েছিলেন। হয়তো ভেবেছিলেন, হয়তো কেন বলছি—তিনি নির্ঘাত ভেবেছিলেন  যে, আমিই জামান ভাইকে বলেছি ওই আলোচনাটি ছাপিয়ে দিতে। আদতে এই ঘটনার আদ্যোপান্ত আমি কিছুই জানি না। আমার ভুল যা কিছু হয়েছিল, বইটি নিয়ে অতি উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে ফেলেছিলাম আনোয়ারা আপার কাছে, আর কিছুই নয়।  হয়তো জামান ভাইও চেয়েছিলেন, বইটির কথা পাঠক জানুক।

আমিনের প্ল্যানের বাইরে এ লেখা ছাপানোর কাজটিকে আমিও মন্দ চোখেই দেখেছিলাম। বিষয়টি আমি জানার পরে জামান ভাইকে পুনঃপুন ফোন করে বলেছি, জামান ভাই, পরের কোনো এক সংখ্যায় লেখাটি যাক। আমিনের ইচ্ছে মতোই সে ছাপুক কোনো এক আগামী সংখ্যায়। কিন্তু জামান ভাই আমার কথায় একদমই কর্ণপাত করেন নি। ওই বিব্রতকর অবস্থাটির জন্য আমি আজও শরমিন্দিত হয়ে থাকি সরকার আমিনের কাছে। সরকার আমিন নিশ্চয়ই আমায় ক্ষমা করবেন, আমার ওই অনিচ্ছাকৃত অপরাধের জন্য।


আমার মাথায় ভেতর তখন নিকষকালো থই-থই-অন্ধকার। কোনো স্মৃতির ধূলিকণাও কোথাও পড়ে নাই।


এত বছর বাদে আমি আজও বলছি, আনোয়ারা সৈয়দ হকের এই বইটি শুধুমাত্র নিছক-ভ্রমণ-কাহিনি থাকে নি, হয়ে উঠেছে মানবিকতার এক উজ্জ্বল-দলিল।

হক ভাইকে নিয়ে আমার অযুত-নিযুত-কথামালার যেমন নিরন্তর-প্রবহমান, আনোয়ারা আপাকে নিয়েও তা একইরকম প্রবহমান। বরং আনোয়ারা আপার সান্নিধ্যের ঊর্মিমালারা আমার কাছে আরও অধিক আদরণীয় ও স্রোতস্বিনী।

এই প্যানডেমিক সময়ের রোগ যখন আমার আয়ুর কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল, কঠিনতম লড়াই শেষে হাসপাতাল থেকে ফিরেই আনোয়ারা আপার ফোনকল পেয়েছি। আপার কণ্ঠে  উৎকণ্ঠা আর বেদনা দুই-ই ঝরে পড়েছে—

পাপড়ি, তোমার করোনা হয়েছে শুনে আমার তো হাঁটু কাঁপতে শুরু করেছে। এই সেদিনের মেয়ে তুমি! তোমার কিছু হলে ভাই আমরা বেঁচে থাকব কী করে? কী করে আমরা আর বাকি জীবন চলতে পারব, বলো? নিজের যত্ন নিও।

বলেই প্রয়োজনীয় কিছু এক্সারসাইজের নিয়ম বাতলে দিয়েছেন।

আমার মাথায় ভেতর তখন নিকষকালো থই-থই-অন্ধকার। কোনো স্মৃতির ধূলিকণাও কোথাও পড়ে নাই। ফলত আমার কোনো বোধই নাই। এক অথর্ব-মস্তিষ্কের আমি একা একা তুমুল-লড়াই করছি জীবনে ফিরে আসবার জন্য।

আপার ফোন পেয়ে আমার মনে হয়েছে—

আমাকে সুস্থ-জীবনে ফিরতে হবে। ফিরতেই হবে এই পৃথিবীর সতেজ আলো আর হাওয়ায়। আমাকে ফিরতে হবে ওই অগ্রজদের ভালোবাসা-স্নেহের-মুকুলগুলি পুনরায় কুড়িয়ে নেবার জন্য।

আনোয়ারা সৈয়দ হক শুধুমাত্র গদ্যকার নন, তিনি একজন কবিও। আর কে-না জানে, কবি মাত্রই অন্যদের চাইতে অনেক বেশি সংবেদনশীল!

আপার একটা কবিতা জুড়ে দিয়ে আজ এ লেখা শেষ করছি—

‘ফুলের গন্ধের মতো থেকে যেতে চাও তুমি আমার রুমালে’,/ হায়, আমার রুমালে কোনো ফুল নেই,/ গন্ধ বা কোথায়/ হিজিবিজি সেলাইয়ের ফোঁড় শুধু এখানে ওখানে/ কাটাছেঁড়া প্রচুর রয়েছে রক্তপাত কখনোবা/ বিবিক্ত জীবন শুধু বহমান আজ/ 'তরঙ্গের অস্থির নৌকায়'/ অসংখ্য ছিদ্রের জোড়াতালি জীবনের পাটাতনে/ ক্ষত দুঃখ জরা দীর্ঘশ্বাসে ভরা এক/ ক্ষীয়মাণ সময়ের ছবি/ সংগ্রাম সংগ্রাম শুধু, এভাবে জীবন।/ সেখানে সহসা তুমি, অকস্মাৎ এই তুমি, প্রেমিকের দুহাত বাড়িয়ে/ ফুলের গন্ধের মতো থেকে যেতে চাও শুধু আমার রুমালে/ এ গন্ধ কোথায় পাব, ফুল বা কোথায়/ রিক্ত হাহাকার শুধু বাতাসের তোড়ে/ ছিন্নভিন্ন হয়ে ওড়ে/ জীবনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে লেপা কাদামাটি/ নিশ্বাসে নিশ্বাসে আজ পচা ঘ্রাণ নাকে ভেসে আসে/ ক্লান্তি ও বেদনা সকলি অশ্রুর আছে/ নিয়েছে আশ্রয়/ সুড়ঙ্গের গভীরে গভীরে আজ ক্রন্দনের ধ্বনি/ আশ্বিনের মেঘে মেঘে নামে কালিমার ঢেউ/ এ ক্রন্দন শুনবে না কেউ/ অপ্রতুল সময়ের টানে সকলি হারায়।/ তবুও তোমার এই বাসনার তীরে/ হতভম্ব আমি এক পড়েছি দাঁড়িয়ে/ জীবন দিয়েছে ডাক দুহাত বাড়িয়ে/ পৃথিবীর বেঁচে থাকা অপরূপ ছবি।/ আমার রুমালে আজ অনন্ত দুপুর/ নীল প্রজাপতি ফিঙে আর ফড়িংয়ের ওড়াউড়ি/ নূপুরের ছন্দে নাচে ভালোবাসার-পরি/ সোনারঙে ছেয়ে গেছে জীবনের ক্লেদাক্ত চাতাল।/ মানবের অস্তিত্বের রহস্যে মাতাল/ এ সুগন্ধি রুমাল/ তুলে রাখি অনন্তের কালের কপোলে।/ কাল নিরবধি বয়ে যাবে/ প্রেমিকের প্রেমিকতা লয়ে।


পর্ব-৪৭

পাপড়ি রহমান

পাপড়ি রহমান

জন্ম ১৯৬৫, ঢাকা। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর। লেখক, সম্পাদক, গবেষক এবং...বিস্তারিত

এই লেখকের সব লেখা