মৃদুল দাশগুপ্ত ● গৌতম চৌধুরী ● মাসুদ খান
কুমার চক্রবর্তী ● হোসেন দেলওয়ার ● জুয়েল মাজহার
কাজী নাসির মামুন ● সোহেল হাসান গালিব ● মোস্তফা হামেদী
সারাজাত সৌম ● হাসান রোবায়েত
মৃদুল দাশগুপ্ত
একটি কবিতা
ভাবি যে সম্পূর্ণ ঘুরে নিটোল বৃত্তটি হব
হয়ে যাব গােল
ভিতরে সকল ফাঁকা, করবে তাে তাও ঘুরঘুর
গােলযােগ বেঁধে যাবে, বকে যাবে আবােল তাবােল
পৃথিবী ওল্টাবে যেন, যদিও বা ঝকঝকে
তখন দুপুর
তা তুমি সরলরেখা, হয়তাে ত্রিভুজ হবে, কিছুতেই
হবে না সুগােল
নড়বে চড়বে তাতে দুইটি গিরির চূড়া, সে প্রায় প্রলয়
বাঁচাও বাঁচাও—বলে তখন ছুটবে ভয়ে স্বয়ং ভূগােল
আমি সে কলহকালে হঠাৎ আরেকখানি হয়ে যাব
শনির বলয়
গৌতম চৌধুরী
অপর গুচ্ছের একটি
কারখানাটির কঙ্কালমাত্র পড়িয়া আছে। টিকিট কাটিয়া তাহাই দেখিতে আসিতেছে অনামুখোর দল। একজন আপনি-মোড়ল গোছের গাইডও জুটিয়াছে। ঘুরিয়া ঘুরিয়া সবকিছু ব্যাখ্যান করিতেছে সে। এইখানে একদিন শব্দে কান পাতা যাইত না। ইয়া ইয়া চাকা ঘুরিত বনবন। চুল্লিতে গনগন করিত আগুন। চিমনি দিয়া পাকাইয়া পাকাইয়া উঠিত ধোঁয়া। তাহার পর মুনি ঋষির জটার মতো উড়িয়া যাইত বাতাসে। তাহার পর? যাহাকে বলে কালের নিয়ম। হাতে-পায়ে জং ধরিল কল-কব্জার। আউলাইয়া গেল চাকার ঘূর্ণন। ফেকসা মারিয়া আসিল চুল্লি। ওই যে—সব কথা লিখা আছে সামনের ফলকে। এইবার আমার দক্ষিণাটি দিয়া দিলে, বিদায় হই।
মাসুদ খান
চুম্বক
এই বিশ্বে কোথাও কি অন্তরালে পড়ে আছে
একখণ্ড অভিমানী চুম্বক, যা থেকে
ক্রমাগত উৎসারিত অগণ্য বাৎসল্য-বলরেখা,
অপত্য স্নেহপ্রবাহ, মেরু থেকে মেরু অভিমুখে?
এ অধীর সন্ধ্যামালতীয় সন্ধ্যা, মাথার ওপরে ওই স্বতঃস্ফূর্ত জ্বলজ্বলে নক্ষত্রসিঁথি,
প্রকৃতির অবিরাম প্লাগ অ্যান্ড প্লে-র লীলা,
মানুষের অন্তর্গত মাধ্যাকর্ষ, কম্পাস-কাঁটায় তার কাঁপা-কাঁপা দিগদর্শন...
সকল বাস্তবতাই মূলত সে-চুম্বকের বাস্তবতা।
তবে
চুম্বকে যে কেবল চুম্বনটানই সত্য, তা তো নয়,
বিকর্ষণও সত্য।
তা ছাড়া দুর্ব্যবহারে যে-কোনো চুম্বক
নিমেষে হারায় তার অবাক ঈশিত্ব।
কুমার চক্রবর্তী
আমার শীতের মদ
আমার শীতের মদ, জাগো আজ অমৃত কুম্ভের দেশে
জেগে ওঠো অনিদ্রায়, রাতের তামসে রাখো প্রাণ,
হাহাকারহীন, থেকে যাও সচকিত বোধের ছায়ায়,
ওইদিকে নাগলিঙ্গমের ফুল চিত্রগন্ধ রেখে যায়
আজ রজনিতে, কী অদ্ভুত পূর্বাপর মৃদুল শোভায়।
আমার দেহের পুষ্পকেতু, হতে চায় রথের সারথি
তরল স্বভাব তার, তাকে আজ দিতে হয়
নিশীথের আহা ও হাহার গান,
এ রাত্রিতে ভাঁটফুল পূর্ণ আর আত্মবিকশিত
মর্ম তাই জেগে ওঠে তরমুজখেতের বিছানাতে
দগ্ধ হয় জীবিতের দেহ আর প্রাণ।
আমার শীতের মদ জেগে ওঠো আদিম স্বভাবে
আমাকে আগুন দাও, জল দাও, দাও আঁচ
লোহার পাত্রের, যেন দেখা দেয় ঘাতচিহ্ন,
জীবনের মরণের, যাপনের যতসব অধিক্ষেত্র,
আরও দাও ঋতুঘোর তপ্ত-উদ্দামতা
আমিও তোমার একচ্ছত্র খাদ্য হব আজ
দাহ হবে এইবার সকল দীনতা!
আমার শীতের মদ , বলো মন, বলো বলো—
জীবনের কেন এই অশ্রুহীন নিপাট ব্যর্থতা
জাগ্রতের কেন তবে এত ঘাত, এত ঘোর ব্যথা!
হোসেন দেলওয়ার
তামসিক
বৃষ্টি হোক জমকালো,
পাথরে ঘর্ষণে কোথাও বিদ্যুৎ চমকালো।
সাদা মেঘ সরে যায়
হরিণনাভির থেকে ফিরে আসে ঘ্রাণ।
ছিলে ময়ুরের বেশে ছদ্মপাখিদের পরিত্রাণ
মৃন্ময়ী এ কোন বৃক্ষের সন্তান।
তামসিক
ঝরে পড়া পাতার অধিক
এই হিমনিশি। পাখিদের গ্রামে
কতিপয় মেঘ কিংবা পাহাড়ের নামে
দ্যাখো ফুল ফুটল দূরে
ধূসর রাত্রির অগোচরে...
জুয়েল মাজহার
ঝরে পড়বার আগে
এ-মধু নিধুবন যখন শেষ হবে
নিভিয়ে যোগাযোগ ইশারা সংলাপ
গভীর যমুনার অতল তলদেশে
গড়িয়ে চলে যাব... অচেনা, আজনবি
পাঁচিল তুলে আর প্রাকার তুলে উঁচু
যে-যার ঠিকানায় আমরা চলে যাব
ভাসব লিথিজলে মরণে, অদেখায়...
আমরা কোনোদিন এ-ওকে ডাকব না
পেছনে ফিরে আর আমরা তাকাব না
শিশ্ন-মাশরুম নিথর যোনিপোকা
অখিল মণ্ডলে পড়বে ঝরে চুপে!
আমরা দূরে বসে খেলব পাশাখেলা
আমরা হাতড়াব অখিল শূন্যতা
গাইব একা বসে যে যার মনোগীত
কাজী নাসির মামুন
বর্ষামঙ্গল
তুমি নাই, এমন নিভৃতি আজো বিফলে হারাই:
অঝোর বৃষ্টির দিন পৃথিবীতে এসেছে আবার
বাঁশপাতা জবুথবু, গাছের সবুজ অবতার
গলিত মেঘের প্রেমে স্নান সারে, তুমিও কি তাই
স্মৃতির বাদল দিনে ভিজে গেছ আমাকে ছাড়াই?
গুড়ুম গুড়ুম ওই আকাশের জলো বেদনার
উতল প্রান্তরে জমা দূরাগত বিরহ আমার
কড়ই পাতার তলে দেহপাখি, একা জল খাই।
এখনো তৃষিত আমি কি জানি কি তুমুল বর্ষায়
খুঁজে ফিরি; অনন্ত হৃদয়পুরে যত গান আছে
নিহিত বন্যার জলে বেমালুম ডুবে যেতে চায়
তবুও খরায় রেখে কে আমাকে টানে এত কাছে?
আষাঢ়-শ্রাবণ ঘিরে ব্যাঙডাকা বর্ষার প্রেমিক
শ্রবণ বধির করে চেয়ে থাকি, ছুঁয়ে তুলে নিক।
সোহেল হাসান গালিব
পুষ্পলাশ
গন্ধ-ফোয়ারার নিচে পড়ে ছিল ফুল—তুমি তাকে
পায়ের তলায় পিষে যদি ফিরে আসো—গন্ধ তার
উড়ে যাবে না তো—যতবার এসে জাগাও আমাকে
যত করো ভর্ৎসনা—মিথ্যাময় অর্থহীনতার—
প্রশ্ন ক’রো না তিমিরবাসী এই অর্ধ-ঘুমন্তরে—
আলোর প্রহার কাকে বলে? কাকে বলে জাগরণ?
কাঁকড়া ও কৃকলাস পড়ে থাক নিভৃত বন্দরে,
তটভূমি পার হও—পাবে তুমি অজস্র তোরণ।
কীটের লাঞ্ছনা মুছে, এখানে চামেলি-ফোটা বনে
একটি পতঙ্গ এসে হয়তোবা দিয়েছিল দোলা।
ডানাভাঙা স্মৃতি তার পৃথিবীর অ্যালবাম-কোণে
আজ শুধু খুঁজে পায় দুটি টিকটিকি আরশোলা।
বাতাসের গায়ে সুড়সুড়ি দিয়ে রেণু তবু ওড়ে—
যদিওবা পথে ফুল নয়—পুষ্পলাশ আছে প’ড়ে।
মোস্তফা হামেদী
রোমন্থন
অনন্ত অতীতের ভেতর একটা সোনার পিতল রয়ে গেছে। যে জীবনে ফেরা যায় না, সিলমোহরে অঙ্কিত সে জীবনের নাম-গন্ধ-যশ। ঘষে ঘষে তুলি শিথিল কল্পনায়। সুন্দর সে জীবন, হাত ফসকে গেছে। গাছপাকা ফল যেন, বাগানের ওপার থেকে দেখা। কোনোদিন ছুঁতে না পারা আলো, অন্তর্ঘাতে ফ্যালে।
আমরা কেবল হাতছানির-ই দাস। ছুঁতে না পারা স্পর্শের মতো জীবন আমাদের। পুরানা যা, তাই ভালো এমন।
রোমন্থন, হয়ে উঠেছে দিনান্তের ক্রিয়া। দূর কোনো ঘ্রাণ ভেতরে জাল ফেলছে তুমুল। এক মশলা-জাহাজ আগাতে পারছে না তীরে অতীতচারিতার টানে।
সারাজাত সৌম
অনুভূতি
কেউ বলবে—তোমার কি হয়েছে!
আমি একদম চুপ—
ঠান্ডা গোলাপের মতো
গভীর রাতে
বাগানের শেষ মাথায়—
তোমার মুখমণ্ডল ছাড়া
আর কিছুই ভাবছি না।
জানি না—মানুষের ভেতর কেমন হয়
যখন সে আমাকে ছেড়ে হাওয়া হয়ে গেছে!
আমি তখনও চুপ—
ভীষণ রকম চুপ
এখন আর তাকে দুঃখ করারও
কোনো উপায় নেই।
হাসান রোবায়েত
জিজ্ঞাসা
মাকে ফোন করে যখন জিজ্ঞাসা করি—
‘তোমার শরীর কেমন মা?’
এই প্রশ্নের পরেই আমার হাত-পা হিম হয়ে আসে—
মা’র কণ্ঠে তখন বিপন্ন বাতাসের ঢেউ
গলায় শান্ত সমুদ্রের লবণাক্ততা—
সন্তানেরা বড় হওয়া মানেই
মায়ের শরীরে হলুদ বনের ঝরাপাতার বিষণ্ণতা
সারি সারি অসুখের ক্লেদ—
‘মা, তোমার শরীর কেমন—?’
এই ভয়ংকর জিজ্ঞাসার কোনো জবাবই দিতে পারে না মা—